প্লাস্টিক বর্জ্যে বিপন্ন বুড়িগঙ্গা; কার্যকর হয়নি নির্দেশনা, প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

বুড়িগঙ্গার তীরে প্লাস্টিক বর্জ্য
বুড়িগঙ্গার তীরে প্লাস্টিক বর্জ্য | ছবি: এখন টিভি
0

দূষণে বিপন্ন বুড়িগঙ্গা। প্লাস্টিক আর তরল বর্জ্যের চাপে বুড়িগঙ্গা হারিয়েছে তার চিরযৌবনা রূপ। সম্প্রতি প্লাস্টিক বর্জ্য সরানোর নির্দেশ দেয়া হলেও চোখে পড়েনি কার্যকারিতা। এমন অবস্থায় পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বুড়িগঙ্গা রক্ষায় দরকার সমন্বিত উদ্যোগ আর আইনের কঠোর প্রয়োগ।

গঙ্গাবুড়ির আঁচলে এই শহরের বেড়ে ওঠা। জলের প্রবাহের মতোই বিস্তৃত হয়েছে রাজধানী ঢাকা।

একসময় চওড়া দরিয়াকে ঘিরে ছিল তীরবর্তীদের যাপন। ভোগবাদের গ্রাসে ধীরে ধীরে সংকীর্ণ বুড়িগঙ্গার গতিপথ।

বদলেছে জলের রং, গুণ আর মান। দখল, দূষণ, নদী ভরাট চেনা রূপ যেন বিলীন। প্লাস্টিকের দৌরাত্ম্য, তরল বর্জ্যের ভারে ক্লান্ত নদী।

এমন অবস্থায় বুড়িগঙ্গার তীরে থাকা সব ধরনের বর্জ্য ১৫ দিনের মধ্যেই অপসারণে ২ সেপ্টেম্বর নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের করা আবেদনের ওপর শুনানিতে এ আদেশ দেয়া হয়। ১৫ দিনের সময়সীমার মধ্যে কতটুকু সরলো বর্জ্য?

নদীর তীর ঘেঁষে লালবাগ, ইসলামবাগ এলাকা এখনো দূষণের দুষ্টুচক্রে নিমজ্জিত। পাখির চোখে দেখা মেলে শত শত প্লাস্টিক বর্জ্যের, যা নদীতে মিশে বাড়াচ্ছে দূষণের মাত্রা।

আরও পড়ুন:

বুড়িগঙ্গার তীরে বসবাসকারীদের মধ্যে একজন বলেন, ‘নদীতে তো দূষণ হইতেই আছে, কিন্তু দেখা গেছে এটা সরকার নিয়ন্ত্রণ করবে যে নদীতে দূষণ কীভাবে মুক্ত করা যায়।’

বুড়িগঙ্গায় নৌকা চালানো একজন মাঝি বলেন, ‘আমরা তো পরিষ্কার চাই। আমরা পরিষ্কার হইলে তো আমরা লাগি ভালো। এই জল মেলে তো চলতে পারি। হাত-পাও ধুইতে পারি, ময়লা থাকে না আমরা হাতও।’

বুড়িগঙ্গার দূষণ পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। অতীতেও আইনি পদক্ষেপ নিয়ে নদী দূষণ বন্ধ করা যায়নি। তবে আইন প্রয়োগের মাধ্যমে শক্ত পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ আইনজীবীদের।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং হলো যে আইন আছে এবং আইন প্রয়োগ কারা করবেন সেটাও বলা আছে। কিন্তু আমরা তাদের প্রয়োগটা দেখি না। যার ফলে বুড়িগঙ্গার দূষণটা দিন দিন বাড়ছে। ঢাকায় যারা বসবাস করি তাদের শরীর এবং স্বাস্থ্য এটা অত্যন্ত ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কাজেই সেই জিনিসটা বিবেচনা করে যদি তারা পদক্ষেপ নেয়, আমার মনে হয় সেটা ভালো হবে।’

পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বুড়িগঙ্গায় প্রায় শতাধিক আউটলেট দিয়ে বিভিন্ন বর্জ্য সরাসরি পানিতে মিশছে। নির্দেশনা সত্ত্বেও স্থানীয় মানুষ ও আশপাশের শিল্প কারখানা নদীর সৌন্দর্যকে নষ্ট করছে। বুড়িগঙ্গার প্রাণ ফেরাতে দীর্ঘমেয়াদে সমন্বিত উদ্যোগ আর সচেতনতা বৃদ্ধির তাগিদ তাদের।

আরও পড়ুন:

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ও ভূগোল বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিব আহমেদ বলেন, ‘পুরো বাংলাদেশ থেকে যে পরিমাণ রিভারগুলো দ্বারা যে প্লাস্টিক বর্জ্য হয়, সেটা ৭০ হাজার টনের মতো। তার মধ্যে ১৫ হাজার টনই হচ্ছে বুড়িগঙ্গা রিভারে, সেটা আমরা পাই। সাস্টেইনেবল যে ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট বা প্লাস্টিক ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্টের জন্য কিন্তু আমরা একটা সমন্বিত উদ্যোগ চাই। এবং ডিফরেন্ট অথরিটি যারা আছে তাদের মধ্যে কমিউনিকেশনটা দরকার।’

সঠিক সময়ে বর্জ্য অপসারণ নিশ্চিত করতে পরিবেশ অধিদপ্তর, বিআইডব্লিউটিএ, ঢাকা ওয়াসাসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাকে নির্দেশনা দেন আদালত। এমন বাস্তবতায় বিআইডব্লিউটিএর জরিপ বলছে, চার শতাধিক দূষণ পয়েন্ট রয়েছে বুড়িগঙ্গায়। দূষণ রোধ ও নদী তীর রক্ষায় সাব-কমিটির মাধ্যমে কাজ করার আশ্বাস তাদের।

বিআইডব্লিউটিএর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবু জাফর মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ কবির বলেন, ‘কীভাবে দূষণ রোধ করা যায়, সেগুলোর জন্য আমরা সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে এরইমধ্যে চিঠি দিয়ে জানিয়েছি। তাদের তারা তাদের ব্যবস্থা গ্রহণ করছে, আমরা অনেকেরই এই রিপ্লাই পেয়েছি। আমরা উচ্ছেদ কার্যক্রম এটা চলমান প্রক্রিয়া, সেটার মাধ্যমে আমরা অবৈধ দখল এবং দূষণ রোধে আমরা প্রতিনিয়তই মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছি।’

বুড়িগঙ্গার দূষণ রোধে হাইকোর্ট যে নির্দেশনা দিয়েছেন, সেটি যে এবারই প্রথম বিষয়টি এমন নয়। এর আগে ২০১০ এবং ২০১১ সালেও এই বুড়িগঙ্গা দূষণ রোধে নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত।

তবে সেই নির্দেশ অমান্য করে এখনো প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলা হচ্ছে নদী তীরে। এমন বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে, কবে আইন মেনে বুড়িগঙ্গা দূষণমুক্ত হবে? আদৌ হবে কি?

এসএস