ক্রসফায়ার কিংবা বিচারবহির্ভূত হত্যা। যে শব্দগুলো দেশের মানুষের মনে এখনও এক ভয়াল স্মৃতি। বিগত আওয়ামী আমলে এই শব্দ ব্যবহার করে বহু মানুষকে হত্যার অভিযোগ ওঠে। যার মধ্যে কক্সবাজারের একরামুল হক, অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা হত্যা থেকে শুরু করে নারায়ণগঞ্জের সাতখুন ছিল অন্যতম আলোচিত ঘটনা। পাশাপাশি গুম, নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে দেশ-বিদেশে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো এসব অভিযোগ এবং ভিন্নমত দমনের চর্চা তৎকালীন সরকারকে কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার অন্যতম প্রতীকে পরিণত করে।
চব্বিশের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময় এসব অভিযোগ আমলে নিয়ে র্যাব ও পুলিশ বাহিনীর ব্যাপক সংস্কারের উদ্যোগ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। যার ধারাবাহিকতা ছিলো বর্তমান সরকার মধ্যেও।
তবে ক্রসফায়ার শব্দটি ফের আলোচনায়। এমন এক সময় বর্তমান পুলিশ প্রধান আলী হোসেন ফকির এই শব্দ ব্যবহার করলেন যখন দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিদিন চলছে আলোচনা সমালোচনা। এরই মধ্যে তার এই বক্তব্য ঘিরে প্রতিবাদ জানিয়ে তার পদত্যাগের দাবি করেছে একাধিক রাজনৈতিক দলসহ নানা মহল।
আরও পড়ুন:
আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়ে আইজিপির বক্তব্যকে বিপজ্জনক আখ্যা দিয়েছে টিআইবি। অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরাধ দমনে কঠোর আইন প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা অবশ্যই রয়েছে। তবে দায়িত্বশীল জায়গা থেকে তার এমন মন্তব্য অগ্রহণযোগ্য।
অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘তার এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে নতুন করে একটা বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। যে পুলিশ মুখে যে আইনের কথা বলছে, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটের কথা বলছে বা আইন প্রয়োগের মধ্য দিয়ে তারা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার কথা বলছে, এটা কি তাদের ভিতরের কথা কি না? এটা কি মনের কথা কি না?’
এনিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের দেয়া বিবৃতিও সন্তোষজনক মনে হয়নি বিশেষজ্ঞদের কাছে। পাশাপাশি সাংবাদিকদের নিয়ে আইজিপির মন্তব্য এক প্রকার কণ্ঠরোধের প্রয়াস বলেও মনে করন তারা।
অপরাধ বিশ্লেষক রেজাউল হক সোহাগ বলেন, ‘আমি পেশাদার বাহিনী, আমার ল আছে এবং আমাকে ল ঠিক করে দিয়েছে আমি কোন পর্যায়ে এই পর্যন্ত যেতে পারব। আমি সেভাবে কাজ করব। সেখানে কঠোরতা বোঝাতে, নমনীয়তা বোঝাতে এই শব্দ তো গ্রহণযোগ্য না।’
ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘দুই একজনের অভিযোগ থাকলেও বা দুই একজনের অভিযোগ আছে, এটা আমরা ধরে নিয়েও যদি বলি, সেই অভিযোগের প্রেক্ষাপটে ঢালাওভাবে সবাইকে অভিযুক্ত করার কোনো যৌক্তিক কোনো কারণ নেই। বরং এর মধ্য দিয়ে যেটা হয়—এক ধরনের শীতল, এক ধরনের হুমকি কণ্ঠ রোধ করার একটা প্রসঙ্গ এখানে চলে আসে।’
এদিকে, আইজিপির বক্তব্য ঘিরে অসস্তিতে বর্তমান সরকারও। সরকারের পক্ষ থেকে আপাতত আনুষ্ঠানিক কিছু না জানালেও অপেক্ষা প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরা।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘এটা তো সরকারকে বিব্রত করার মতো অবস্থা। একটি বাহিনীর প্রধান হয়ে আপনার মুখ দিয়ে এ ধরনের কথা, এটা সত্যি আমাদেরকে ভাবিয়ে তুলেছে।’
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘আইজিপির ব্যাপারে যদি কোনো অন্য ধরনের সিদ্ধান্ত থাকারও প্রবণতা থাকে, প্রধানমন্ত্রী তো দেশে নেই। এটা উনি বিবেচনা করবেন, উনি কী করবেন।’
২০২১ সালে ডিসেম্বরে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে তৎকালীন র্যাব ও সংস্থাটির সাবেক প্রধান বেনজীর আহমেদসহ একাধিক কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। পরে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে পুরা সংস্থার নামই পরিবর্তন করে এসআরবি করে।





