Recent event

শাবান মাসের চাঁদ দেখা যায়নি, শবে বরাত ৩ ফেব্রুয়ারি

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি | ছবি: সংগৃহীত
7

বাংলাদেশের আকাশে আজ (সোমবার, ১৯ জানুয়ারি) কোথাও ১৪৪৭ হিজরি সনের পবিত্র শাবান মাসের চাঁদ দেখা যায়নি (Shaban Moon Not Sighted in Bangladesh)। ফলে আগামীকাল(মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারি) রজব মাসের ৩০ দিন পূর্ণ হবে এবং আগামী ২১ জানুয়ারি (বুধবার) থেকে পবিত্র শাবান মাস গণনা শুরু হবে (Shaban Month Start Date 2026)। সেই অনুযায়ী, আগামী ৩ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার দিবাগত রাতে (Tuesday Night, 3rd February) সারা দেশে পবিত্র শবে বরাত পালিত হবে (Shab-e-Barat Date in Bangladesh)।

একনজরে: শাবান মাস ও পবিত্র শবে বরাত ২০২৬

পবিত্র শাবান মাসের চাঁদ দেখা এবং শবে বরাত ২০২৬ সংক্রান্ত তথ্যাদি একনজরে নিচে দেওয়া হলো:

  • চাঁদ দেখা: ২০ জানুয়ারি ২০২৬, সোমবার (১৪৪৭ হিজরি)—চাঁদ দেখা যায়নি।
  • শাবান মাস শুরু: ২১ জানুয়ারি ২০২৬, বুধবার।
  • শবে বরাতের তারিখ: ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, মঙ্গলবার দিবাগত রাত।
  • নির্ধারক: ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি।
  • মূল তাৎপর্য: ক্ষমা লাভ, রহমত বর্ষণ ও ভাগ্য নির্ধারণের মহিমান্বিত রজনী।
  • প্রধান আমল: নফল নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির ও পরদিন নফল রোজা।
  • বিশেষ গুরুত্ব: রমজান মাসের চূড়ান্ত প্রস্তুতি ও গুনাহ মাফের বিশেষ সুযোগ।

আরও পড়ুন:

জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সিদ্ধান্ত (National Moon Sighting Committee Decision)

সোমবার সন্ধ্যায় ইসলামিক ফাউন্ডেশন বায়তুল মোকাররম সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সভায় (Meeting of Moon Sighting Committee) এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামাল উদ্দিন।

তথ্য পর্যালোচনায় শবে বরাতের তারিখ (Reviewing Moon Sighting Data)

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দেশের সব জেলা প্রশাসন, আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবন প্রতিষ্ঠান (SPARRSO) থেকে পাওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে যে, সোমবার সন্ধ্যায় দেশের কোথাও চাঁদ দেখা যাওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।

সভায় উপস্থিত ছিলেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক আ. ছালাম খান, প্রধান তথ্য কর্মকর্তা মো. নিজামুল কবীর এবং ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষসহ বিশিষ্ট আলেম-ওলামাগণ।

পবিত্র শবে বরাত বা লাইলাতুল বরাত (মুক্তির রাত) হলো মহিমান্বিত এক রজনী। ফারসি 'শব' মানে রাত এবং আরবি 'বরাত' মানে মুক্তি। ইসলামের ইতিহাসে এই রাতটি ক্ষমা, রহমত এবং ভাগ্য নির্ধারণের রাত হিসেবে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

আরও পড়ুন:

শবে বরাতের বিস্তারিত তাৎপর্য (Significance of Shab-e-Barat)

মুক্তির রজনী (Night of Salvation):

ইসলামি বিশ্বাস মতে, এ রাতে আল্লাহ তাআলা বান্দাদের জন্য তাঁর রহমতের দ্বার উন্মুক্ত করে দেন। আন্তরিক তওবার মাধ্যমে অসংখ্য পাপী বান্দা এ রাতে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পায় বলে একে 'শবে বরাত' বলা হয়।

ভাগ্য রজনী (Night of Destiny):

অনেক মুফাসসিরের মতে, এ রাতে পরবর্তী এক বছরের জন্য মানুষের রিজিক, হায়াত ও মউতসহ যাবতীয় ভাগ্য লিপি ফেরেশতাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তবে এই মত নিয়ে ওলামায়ে কেরামদের মধ্যে বৈচিত্র্য রয়েছে।

গুনাহ মাফের সুযোগ (Forgiveness):

এ রাতে মহান আল্লাহ দুনিয়ার আসমানে নেমে আসেন এবং বান্দাদের ডাকতে থাকেন— "কে আছো ক্ষমা চাওয়ার? আমি ক্ষমা করব। কে আছো রিজিক চাওয়ার? আমি রিজিক দেব।" এটি আত্মশুদ্ধির এক সুবর্ণ সুযোগ।

আরও পড়ুন:

শবে বরাত নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাদিস (Important Hadith on Shab-e-Barat)

শবে বরাতের ফজিলত সম্পর্কে বেশ কিছু সহিহ ও হাসান (নির্ভরযোগ্য) হাদিস বর্ণিত হয়েছে:

১. ক্ষমা লাভ ও আল্লাহর দৃষ্টিপাত: হজরত মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেছেন— "অর্ধ শাবানের রাতে (শবে বরাতে) আল্লাহ তাআলা তাঁর সৃষ্টির প্রতি রহমতের দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী (হিংসুক) ব্যক্তি ছাড়া তাঁর সমস্ত সৃষ্টিকে ক্ষমা করে দেন।" (সহিহ ইবনে হিব্বান: ৫৬৬৫, তাবারানি: ২০/১০৯)

২. ইবাদত ও রোজার গুরুত্ব: হজরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন— "যখন অর্ধ শাবানের রাত (১৪ তারিখ দিবাগত রাত) আসে, তখন তোমরা রাতে নফল ইবাদত করো এবং দিনের বেলায় রোজা রাখো। কারণ সূর্যাস্তের পর মহান আল্লাহ দুনিয়ার আসমানে নেমে আসেন এবং বলতে থাকেন— কে আছো ক্ষমাপ্রার্থী? আমি তাকে ক্ষমা করব; কে আছো রিজিকপ্রার্থী? আমি তাকে রিজিক দেব; কে আছো বিপদগ্রস্ত? আমি তাকে বিপদমুক্ত করব।" (সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৩৮৮)

৩. অসংখ্য মানুষকে ক্ষমা: হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন— একদিন রাতে আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। পরে তাঁকে জান্নাতুল বাকিতে (কবরস্থানে) পেলাম। তখন তিনি বললেন— "নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা অর্ধ শাবানের রাতে দুনিয়ার আসমানে নেমে আসেন এবং 'বনু কালব' গোত্রের ভেড়া-বকরির পশমের চেয়েও বেশি সংখ্যক মানুষকে ক্ষমা করে দেন।" (সুনানে তিরমিজি: ৭৩৯)

আরও পড়ুন:

শবে বরাতের করণীয় ও বর্জনীয়

করণীয়: ব্যক্তিগতভাবে নফল নামাজ (তাহাজ্জুদ, সালাতুত তাসবিহ), কুরআন তিলাওয়াত, জিকির-আসকার, তওবা-ইস্তেগফার এবং মৃত আত্মীয়-স্বজনের জন্য দোয়া (কবর জিয়ারত)।

বর্জনীয়: আলোকসজ্জা, আতশবাজি, হালুয়া-রুটি নিয়ে বাড়াবাড়ি বা নির্দিষ্ট কোনো পদ্ধতিতে জামাতের সাথে নফল নামাজ পড়ার কোনো প্রমাণ নেই। এগুলো এড়িয়ে চলাই উত্তম।

আরও পড়ুন:

শবে বরাত ২০২৬ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর (Q&A-FAQ)

প্রশ্ন: ২০২৬ সালের শবে বরাত কত তারিখে? (When is Shab-e-Barat 2026)

উত্তর: ২০ জানুয়ারি চাঁদ দেখা না যাওয়ায়, আগামী ৩ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার দিবাগত রাতে বাংলাদেশে পবিত্র শবে বরাত পালিত হবে।

প্রশ্ন: শবে বরাত শব্দের অর্থ কী? (Meaning of Shab-e-Barat)

উত্তর: 'শব' মানে রাত এবং 'বরাত' মানে মুক্তি বা ভাগ্য। অর্থাৎ শবে বরাত মানে হলো মুক্তির রজনী।

প্রশ্ন: শবে বরাতের নামাজের নিয়ম কী? (Shab-e-Barat Prayer Rules)

উত্তর: এই রাতে নামাজের নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা বা আলাদা নিয়ম নেই। দুই রাকাত করে নফল নামাজ যত খুশি পড়া যায়। সুরা ফাতিহার পর যেকোনো সুরা দিয়ে এই নামাজ পড়া যায়।

আরও পড়ুন:

প্রশ্ন: শবে বরাতে কত রাকাত নামাজ পড়তে হয়? (How many rakat in Shab-e-Barat)

উত্তর: এটি নফল ইবাদত, তাই রাকাতের কোনো সীমা নেই। সাধারণত মানুষ ৮, ১২ বা ২০ রাকাত বা তার বেশি পড়ে থাকেন। তবে ইবাদতের মান (নিষ্ঠা) সংখ্যার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

প্রশ্ন: শবে বরাতের রোজা কয়টি ও কবে রাখতে হয়? (Shab-e-Barat Fasting Date)

উত্তর: শবে বরাতের পরদিন অর্থাৎ ১৫ই শাবান (৪ ফেব্রুয়ারি, বুধবার) রোজা রাখা মুস্তাহাব। অনেকে ১৩, ১৪ ও ১৫ই শাবান 'আইয়ামে বিজ'-এর তিনটি রোজা রাখেন।

প্রশ্ন: শবে বরাতের বিশেষ কোনো দোয়া আছে কি? (Special Dua for Shab-e-Barat)

উত্তর: বিশেষভাবে কোনো দোয়া নেই, তবে বেশি বেশি "আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন, তুহিব্বুল আফওয়া ফাফু আন্নি" এবং ইস্তেগফার পড়া উত্তম।

প্রশ্ন: শবে বরাতে কি ভাগ্য নির্ধারণ হয়? (Is destiny written on Shab-e-Barat?)

উত্তর: অনেক তাফসিরবিদের মতে, এ রাতে আগামী এক বছরের রিজিক, জন্ম-মৃত্যু ও ভাগ্য ফেরেশতাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

আরও পড়ুন:

প্রশ্ন: শবে বরাতের রাতে কবর জিয়ারত করা কি জায়েজ? (Visiting graveyard on Shab-e-Barat)

উত্তর: হ্যাঁ, রাসুলুল্লাহ (সা.) এই রাতে জান্নাতুল বাকিতে গিয়ে মৃতদের জন্য দোয়া করেছেন। তাই কবর জিয়ারত করা সুন্নাত।

প্রশ্ন: শবে বরাতের রাতে হালুয়া-রুটি খাওয়া কি বাধ্যতামূলক? (Is Halwa-Ruti mandatory?)

উত্তর: না, এটি ইসলামের কোনো আবশ্যিক বিধান নয়; বরং এটি একটি বাঙালি সামাজিক সংস্কৃতি। ইবাদতের চেয়ে খাবার নিয়ে বেশি ব্যস্ত হওয়া অনুচিত।

প্রশ্ন: শবে বরাতে কাদের গুনাহ মাফ হয় না? (Who are not forgiven on this night?)

উত্তর: হাদিস অনুযায়ী, মুশরিক (আল্লাহর সাথে শরিককারী) এবং বিদ্বেষ পোষণকারী (হিংসুক) ব্যক্তি ছাড়া সবাইকে আল্লাহ ক্ষমা করেন।

প্রশ্ন: শবে বরাতের নামাজ কি জামাতে পড়তে হয়? (Congregational prayer on Shab-e-Barat)

উত্তর: নফল নামাজ ঘরে একাকী পড়া উত্তম। তবে মসজিদেও পড়া যায়। শবে বরাতের জন্য আলাদা কোনো জামাত বা বিশেষ পদ্ধতি ইসলামে নেই।

প্রশ্ন: শবে বরাতে আতশবাজি বা আলোকসজ্জা করা কি ঠিক? (Fireworks and illumination)

উত্তর: না, আতশবাজি বা পটকা ফোটানো সম্পূর্ণ অপচয় ও গুনাহের কাজ। এটি ইবাদতের পবিত্রতা নষ্ট করে।

প্রশ্ন: শবে বরাত ও শবে কদর কি এক? (Difference between Shab-e-Barat and Shab-e-Qadr)

উত্তর: না। শবে বরাত হলো শাবান মাসের ১৫ তারিখের রাত, আর শবে কদর হলো রমজান মাসের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোর একটি (সাধারণত ২৭শে রমজান)। শবে কদর শবে বরাতের চেয়েও বেশি মর্যাদাবান।

প্রশ্ন: পিরিয়ড বা ঋতুস্রাব অবস্থায় মহিলারা কি এই রাতে ইবাদত করতে পারবেন?

উত্তর: পিরিয়ড অবস্থায় নামাজ ও কুরআন স্পর্শ করা যাবে না। তবে মহিলারা জিকির-আসকার, তসবিহ পাঠ এবং আল্লাহর কাছে মুখে দোয়া করতে পারবেন।

প্রশ্ন: শবে বরাতের রাতে ঘুমানো কি জায়েজ?

উত্তর: হ্যাঁ, ইবাদত শেষে ক্লান্ত বোধ করলে ঘুমানো যাবে। সারা রাত জেগে থাকতেই হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তবে ফজর নামাজ যেন কাজা না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।


ইএ