পাহাড়সমান ঋণ থাকলেও মুক্তির বিশেষ দোয়া (Powerful dua for debt relief in Islam)
হজরত আলী (রা.)-এর কাছে এক ব্যক্তি নিজের ঋণ পরিশোধের জন্য সাহায্য চাইলে তিনি তাকে বলেন, "আমি তোমাকে এমন একটি দোয়া শিখিয়ে দিচ্ছি যা আমাকে রাসুলুল্লাহ (সা.) শিখিয়েছিলেন। এই দোয়া পাঠ করলে আল্লাহই তোমার ঋণমুক্তির ব্যাপারে দায়িত্ব নেবেন, যদি তোমার ঋণ পাহাড়সমানও হয়।"
দোয়াটি হলো: اللَّهُمَّ اكْفِنِي بِحَلَالِكَ عَنْ حَرَامِكَ وَأَغْنِنِي بِفَضْلِكَ عَمَّنْ سِوَاكَ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাকফিনি বিহালালিকা আন হারামিকা, ওয়া আগনিনি বিফাদলিকা আম্মান সিওয়াকা।
অর্থ: হে আল্লাহ! হারামের পরিবর্তে তোমার হালাল রুজি আমার জন্য যথেষ্ট করো। আর তোমাকে ছাড়া আমাকে কারো মুখাপেক্ষী করো না এবং স্বীয় অনুগ্রহ দিয়ে আমাকেচ্ছলতা দান করো। (সুনানে তিরমিজি: ৩৫৬৩)
আরও পড়ুন:
ঋণ থেকে মুক্তি পেতে রাসুলের (সা.) শেখানো আরও ৩টি দোয়া (Dua for financial breakthrough)
নবীজি (সা.) উম্মতদের অর্থনৈতিক সংকট, অভাব-অনটন এবং মানুষের ঋণগ্রস্ততা থেকে নিরাপদে থাকতে আরও তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দোয়া ও আমল (Islamic rulings and prayers for loan repayment) করার নির্দেশ দিয়েছেন:
১. দারিদ্র্য ও অসম্মান থেকে আশ্রয়ের দোয়া (Dua for removing poverty and distress)
রাসুল (সা.) নিয়মিত এই দোয়াটির মাধ্যমে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْفَقْرِ وَالْقِلَّةِ وَالذِّلَّةِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ أَنْ أَظْلِمَ أَوْ أُظْلَمَ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযুবিকা মিনাল-ফাকরি ওয়াল-কিল্লাতি ওয়াযযিল্লাতি ওয়া আউযুবিকা মিন আন আযলিমা আও উযলামা।
অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে দারিদ্র্য থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আশ্রয় প্রার্থনা করছি আপনার কম অনুকম্পা ও অসম্মান থেকে এবং আমি কারো প্রতি জুলুম করা থেকে বা নিজে জুলুমের শিকার হওয়া থেকে। (সুনানে আবু দাউদ, সুনানে নাসাঈ)
আরও পড়ুন:
২. ঋণ পরিশোধ ও রিযিক বৃদ্ধির সর্বশ্রেষ্ঠ দোয়া (Prophet's prayer for clearing massive debts)
সহিহ মুসলিমের বর্ণনা অনুযায়ী, ঋণের বোঝা থেকে মুক্তি পেতে এবং অভাব দূর করতে নবীজি (সা.) এই দীর্ঘ দোয়াটি পাঠ করতেন:
اللَّهُمَّ رَبَّ السَّمَوَاتِ وَرَبَّ الأَرْضِ وَرَبَّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ رَبَّنَا وَرَبَّ كُلِّ شَىْءٍ فَالِقَ الْحَبِّ وَالنَّوَى وَمُنْزِلَ التَّوْرَاةِ وَالإِنْجِيلِ وَالْفُرْقَانِ أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ كُلِّ شَىْءٍ أَنْتَ آخِذٌ بِنَاصِيَتِهِ اللَّهُمَّ أَنْتَ الأَوَّلُ فَلَيْسَ قَبْلَكَ شَىْءٌ وَأَنْتَ الآخِرُ فَلَيْسَ بَعْدَكَ شَىْءٌ وَأَنْتَ الظَّاهِرُ فَلَيْسَ فَوْقَكَ شَىْءٌ وَأَنْتَ الْبَاطِنُ فَلَيْسَ دُونَكَ شَىْءٌ اقْضِ عَنَّا الدَّيْنَ وَأَغْنِنَا مِنَ الْفَقْرِ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা রাব্বিস-সামাওয়াতি ওয়া রাব্বিল-আরদি ওয়া রাব্বিল-আরশিল-আজিম, রাব্বানা ওয়া রাব্বা কুল্লি শাইইন, ফালিকাল-হাব্বি ওয়ান-নাওয়া, ওয়া মুনযিলাত-তাওরাতি ওয়াল-ইনজিলি ওয়াল-ফুরকান। আউযুবিকা মিন শাররি কুল্লি শাইইন আনতা আখ্যিুন বিনাসিয়াতিহি। আল্লাহুম্মা আনতাল-আউয়ালু ফালাইসা কাবলাকা শাইউন, ওয়া আনতাল-আখিরু ফালাইসা বা’দাকা শাইউন, ওয়া আনতায-যাহিরু ফালাইসা ফাওকাকা শাইউন, ওয়া আনতাল-বাতিনু ফালাইসা দুনাকা শাইউন। ইকযি আন্নার-দাইনা ওয়া আগনিনা মিনাল-ফাকরি।
অর্থ: হে আল্লাহ! আপনি আকাশ, জমিন ও মহান আরশের প্রতিপালক। আমাদের প্রতিপালক ও সব কিছুর প্রতিপালক। আপনি বীজ ও উদ্ভিদের সৃষ্টিকর্তা, আপনি তাওরাত, ইনজীল ও ফুরকানের অবতীর্ণকারী। আমি আপনার কাছে এমন সব ধরণের অনিষ্ট থেকে মুক্তি চাই, আপনি যার নিয়ন্ত্রক। হে আল্লাহ! আপনিই আদি, আপনার আগে কোনো কিছু নেই এবং আপনিই অন্ত আপনার পরে কোনো কিছু নেই। আপনি প্রকাশ্য, আপনার ঊর্ধ্বে কেউ নেই। আপনিই অপ্রকাশ্য, আপনার অগোচরে কিছু নেই। আমাদের ঋণ পরিশোধ করে দিন এবং দারিদ্র্য থেকে আমাদের মুক্ত করে দিন। (সহিহ মুসলিম)
আরও পড়ুন:
৩. সকাল-সন্ধ্যার আমল: দুশ্চিন্তা ও ঋণের বোঝা দূর করার দোয়া (Morning and evening azkar for debt)
ঋণগ্রস্ততা মানুষের মন থেকে শান্তি কেড়ে নেয়। এই মানসিক কষ্ট দূর করতে নবীজি (সা.) সকাল ও সন্ধ্যায় একটি বিশেষ দোয়া পড়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
হজরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) বর্ণনা করেন, একদিন রাসুল (সা.) মসজিদে প্রবেশ করে আনসারি সাহাবি আবু উমামাকে (রা.) অসময়ে বসে থাকতে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, "আবু উমামা! মসজিদে বসে আছ কেন? এখন তো নামাজের সময় নয়।" আবু উমামা (রা.) উত্তর দিলেন, "ঋণভারে জর্জরিত ও সীমাহীন দুশ্চিন্তার কারণে অসময়ে মসজিদে বসে আছি হে আল্লাহর রাসুল!" তখন নবিজি (সা.) তাকে সকাল-সন্ধ্যা এই দোয়াটি পড়ার নির্দেশ দেন:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الْعَجْزِ وَالْكَسَلِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الْجُبْنِ وَالْبُخْلِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ غَلَبَةِ الدَّيْنِ وَقَهْرِ الرِّجَالِ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নী আউযুবিকা মিনাল-হাম্মি ওয়াল-হুযনি, ওয়া আউযুবিকা মিনাল-আজযি ওয়াল-কাসালি, ওয়া আউযুবিকা মিনাল-জুবনি ওয়াল-বুখলি, ওয়া আউযুবিকা মিন গালাবাতিদ-দাইনি ওয়া কাহরির-রিজাল।
অর্থ: হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে দুশ্চিন্তা ও পেরেশানি থেকে মুক্তি চাই। আশ্রয় চাই অপারগতা ও অলসতা এবং কৃপণতা ও কাপুরুষতা থেকে এবং ঋণের বোঝা ও মানুষের কঠোরতা থেকে। (সুনানে আবু দাউদ)
আবু উমামা (রা.) বলেন, "আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশনা অনুযায়ী সকাল-সন্ধ্যা এই আমলটি শুরু করি। এর ফলে আল্লাহ তাআলা অল্প দিনেই আমার সব দুশ্চিন্তা দূর করে দেন এবং অলৌকিকভাবে আমার ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা করে দেন।"
আরও পড়ুন:
৪. পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ও তাকওয়া অবলম্বন
যে ব্যক্তি মহান আল্লাহকে মনে-প্রাণে ভয় করে এবং যথাযথভাবে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজসহ অন্যান্য ইবাদত সম্পন্ন করে, আল্লাহ তাআলা তার অভাবমুক্তির পথ তৈরি করে দেন। পবিত্র কোরআনের ঘোষণা অনুযায়ী,
“আর যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য নিষ্কৃতির পথ বের করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।” (সূরা তালাক: ২-৩)।
৫. ঋণ পরিশোধের দৃঢ় নিয়ত ও প্রচেষ্টা
সহিহ বুখারির একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে ব্যক্তি মানুষের কাছ থেকে সম্পদ বা ঋণ নেওয়ার সময় তা পরিশোধের সৎ ও দৃঢ় নিয়ত রাখে, আল্লাহ তাআলা নিজ দায়িত্বে তার পক্ষ থেকে তা পরিশোধের ব্যবস্থা করে দেন। পক্ষান্তরে, যে ব্যক্তি তা আত্মসাৎ বা নষ্ট করার উদ্দেশ্যে নেয়, আল্লাহ তাকে ধ্বংস করে দেন। তাই ঋণমুক্তির প্রথম এবং প্রধান শর্ত হলো মনে মনে তা দ্রুত পরিশোধের খাঁটি ইচ্ছা রাখা।
ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, ঋণ থেকে মুক্তি পেতে শুধু মুখে দোয়া করলেই চলবে না; বরং বাস্তব জীবনে মিতব্যয়ী হতে হবে এবং উপার্জনের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। হালাল উপার্জনের অক্লান্ত চেষ্টা এবং আল্লাহর ওপর অবিচল ভরসা এই দুইয়ের সমন্বয়েই একজন মুমিন বান্দা দ্রুত ঋণ থেকে মুক্তি লাভ করতে পারেন।
একনজরে পাহাড়সম ঋণ থেকে মুক্তির ৪টি পরীক্ষিত দোয়া ও আমল (4 Tested Duas for Debt Relief & Poverty Elimination at a Glance)
اللَّهُمَّ اكْفِنِي بِحَلَالِكَ عَنْ حَرَامِكَ وَأَغْنِنِي بِفَضْلِكَ عَمَّنْ سِوَاكَ
**উচ্চারণ:** আল্লাহুম্মাকফিনি বিহালালিকা আন হারামিকা, ওয়া আগনিনি বিফাদলিকা আম্মান সিওয়াকা।
**অর্থ:** হে আল্লাহ! হারামের পরিবর্তে তোমার হালাল রুজি আমার জন্য যথেষ্ট করো। আর তোমাকে ছাড়া আমাকে কারো মুখাপেক্ষী করো না এবং স্বীয় অনুগ্রহ দিয়ে আমাকে স্বচ্ছলতা দান করো।
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْفَقْرِ وَالْقِلَّةِ وَالذِّلَّةِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ أَنْ أَظْلِمَ أَوْ أُظْلَمَ
**উচ্চারণ:** আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযুবিকা মিনাল-ফাকরি ওয়াল-কিল্লাতি ওয়াযযিল্লাতি ওয়া আউযুবিকা মিন আন আযলিma আও উযলামা।
**অর্থ:** হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে দারিদ্র্য, স্বল্পতা ও অসম্মান থেকে আশ্রয় চাচ্ছি এবং আমি কারো প্রতি জুলুম করা বা নিজে জুলুমের শিকার হওয়া থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।
اللَّهُمَّ رَبَّ السَّمَوَاتِ وَرَبَّ الأَرْضِ... اقْضِ عَنَّا الدَّيْنَ وَأَغْنِنَا مِنَ الْفَقْرِ
**উচ্চারণ (শেষাংশ):** ...আল্লাহুম্মা আনতাল-আউয়ালু... ইকযি আন্নাদ-দাইনা ওয়া আগনিনা মিনাল-ফাকরি।
**অর্থ:** হে আল্লাহ! আপনি আকাশ, জমিন ও মহান আরশের প্রতিপালক... আমাদের যাবতীয় ঋণ পরিশোধ করে দিন এবং দারিদ্র্য থেকে আমাদের মুক্তি দান করুন।
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الْعَجْزِ وَالْكَسَلِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الْجُبْنِ وَالْبُخْلِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ غَلَبَةِ الدَّيْنِ وَقَهْرِ الرِّجَالِ
**উচ্চারণ:** আল্লাহুম্মা ইন্নী আউযুবিকা মিনাল-হাম্মি ওয়াল-হুযনি, ওয়া আউযুবিকা মিনাল-আজযি ওয়াল-কাসালি, ওয়া আউযুবিকা মিনাল-জুবনি ওয়াল-বুখলি, ওয়া আউযুবিকা মিন গালাবাতিদ-দাইনি ওয়া কাহরির-রিজাল।
**অর্থ:** হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে দুশ্চিন্তা, পেরেশানি, অপারগতা, অলসতা, কৃপণতা ও কাপুরুষতা থেকে এবং ঋণের বোঝা ও মানুষের কঠোরতা থেকে আশ্রয় চাই।
ক্রমিংক ও আমল
(No. & Hadith Source)আরবি দোয়া, উচ্চারণ ও অর্থ
(Arabic Dua, Pronunciation & Meaning)আমলের নিয়ম ও ফজিলত
(Virtues & Timings)
আমল ১
হজরত আলী (রা.)-এর বর্ণিত দোয়া
তিরমিজি: ৩৫৬৩
পাহাড়সমান ঋণ থাকলেও তা পরিশোধের দায়িত্ব আল্লাহ নিজে নেন।
আমল ২
দারিদ্র্য ও অসম্মান থেকে মুক্তি
আবু দাউদ ও নাসাঈ
তীব্র অভাব-অনটন দূর করতে এবং রিযিকের বরকতে অত্যন্ত কার্যকর।
আমল ৩
ঋণ ও অভাব মুক্তির সর্বশ্রেষ্ঠ দোয়া
সহিহ মুসলিম
ঘুমানোর আগে বিছানায় গিয়ে পড়ার বিশেষ আমল।
আমল ৪
দুশ্চিন্তা ও ঋণের বোঝা দূরীকরণ
আবু দাউদ: ১৫৫৫
সকাল ও সন্ধ্যায় নিয়মিত পঠিতব্য (আবু উমামা রা.-এর ঋণমুক্তির আমল)।




