আর্থিক স্বচ্ছলতার প্রশ্নে দেশের ৫২ ক্রীড়া ফেডারেশনের মধ্যে সবার ওপরে বিসিবি। বৈশ্বিকভাবেই চতুর্থ ধনী ক্রিকেট বোর্ডের তকমা তাদের নামের পাশে। অথচ রাষ্ট্রীয় সংস্থা জাতীয় ক্রীড়া পরিষদকে (এনএসসি) প্রাপ্য অর্থ দেয়ার বিষয়টা যেনো বেমালুম ভুলে গেছে বিসিবি। এখন টিভির হাতে থাকা তথ্য, উপাত্ত আর অভিযোগ বলছে, প্রায় ১৭ বছর ধরে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে চুক্তির টাকা দিচ্ছে না ক্রিকেট বোর্ড।
২০০৮ সালের চুক্তি অনুযায়ী বিসিবি টিভি সম্প্রচার স্বত্ত্ব থেকে আয়ের ১০ শতাংশ এনএসসির কাছে জমা দেবে। এ সময়ের মধ্যে প্রকাশিত ৮ বছরের হিসেব অনুযায়ী ১৭ কোটি ১৮ লাখ ৭৮ হাজার টাকা এনএসসিকে দেয়ার কথা ক্রিকেট বোর্ডের। সেই হিসেবে ধারণা করা যায়, দেড় যুগে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা এনএসসিকে দিতে বাধ্য ছিলো দেশের ক্রিকেটের সর্বোচ্চ সংস্থা।
এনএসসির পরিচালক আমিনুল ইহসান বলেন, ‘২০০৮ সালে ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে আমরাদের একটি চুক্তি হয়েছিলো। গেইট মানির (টিকিট বিক্রি) জন্য এনএসসিকে দেবে ১৫ শতাংশ, বিসিবি আর প্রচারের টাকা শতকরা ১০ ভাগ টাকা এনএসসিকে দেবে।’
আরও পড়ুন
এরপর পেরিয়েছে অনেক বছর। বিসিবি এ সময়ে হয়েছে আরও বেশি প্রভাবশালী। সরকারের সঙ্গে বিসিবির দূরত্বও কমেছে অনেকটা। রাজস্ব ফাঁকির ধারার শুরু হয়েছিলো সাবেক বিসিবি সভাপতি আ হ ম মোস্তফা কামাল আর নাজমুল হাসান পাপনের হাত ধরে। এরপরের বোর্ডের অনেকেই জানেনও না এ চুক্তির বিষয়ে।
এ নিয়ে জানতে চাইলে বিসিবির সদ্য বিদায়ী কমিটির ফাইন্যান্স চেয়ারম্যান এম নাজমুল ইসলাম ক্ষুদেবার্তায় এখন টিভিকে জানান, তার কাছে এ সংক্রান্ত কোনো তথ্য নেই। এনএসসি বলছে কিছুক্ষেত্রে গেট মানি দিলেও সম্প্রচার স্বত্ত্বের টাকা দেয়নি বিসিবি।
আমিনুল ইহসান বলেন, ‘২০২২ আর ২০২৪ অর্থবছরের জন্য ৪৫ লাখ ২৪ হাজার ৫৭৭ টাকা পরিশোধে করেছে তারা। কিন্তু এ সময়টায় এনএসসিকে প্রচার ও বিপণনের টাকার হিসেব আর পাইনি টাকাও দেয়নি।’
অবশ্য গেটমানির ক্ষেত্রেও এনএসসিকে বড় অঙ্কের অর্থ ফাঁকি দিয়েছে বিসিবি। ১৯৯১ সালের চুক্তি অনুযায়ী টিকিট বিক্রি থেকে আয়ের ১৫ শতাংশ অর্থ রাষ্ট্রীয় সংস্থাটির কোষাগারে জমা দেবে ক্রিকেট বোর্ড। তবে অর্থ আদায় করা তো দূরে কথা, আয়ের হিসাবটাও দেয়নি বিসিবি।
আরও পড়ুন
কেবল ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজন করে ৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা আয় দেখায় সংস্থাটি। সে হিসেবে এনএসসির প্রাপ্য ৬৭ লাখ টাকার বেশি। তবে এর আগে-পরে কোনো বছরেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে আয়ের হিসাব দেখানো হয়নি বিসিবি।
এদিকে, বিপিএলেও আয়ের অঙ্কে বেশ গড়মিল আছে। শুরুর আসর থেকে ২০২৪ পর্যন্ত ১০ আসরে বিসিবি আয় দেখিয়েছিলো মাত্র ১৫ কোটি টাকা। যেখানে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর ১ আসরেই ফারুক আহমেদের কমিটি টিকিট থেকে আয় দেখায় ১৩ কোটি টাকা। সে হিসেবে বিপিএল এবং আন্তর্জাতিক ম্যাচ মিলিয়ে সঠিক হিসেব পাওয়া না গেলেও ধারণা করা হচ্ছে, অন্তত ১৫-২০ কোটি টাকা এনএসসিকে ফাঁকি দিয়েছে বিসিবি।
এভাবে বছরের পর বছর কোন ক্ষমতার বলে রাষ্ট্রের মোটা অঙ্কের অর্থ ফাঁকি দিয়ে যাচ্ছে বিসিবি? সাবেক পরিচালক সিরাজউদ্দিন আলমগীর মনে করেন, রাজনৈতিক ব্যক্তিরা বিসিবির সিংহাসনে থাকায় রাষ্ট্রকে অগ্রাহ্য করার সাহস পায় সংস্থাটি।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সাবেক পরিচালক সিরাজউদ্দিন আলমগীর বলেন, ‘বিসিবির সভাপতি ও ক্রীড়ামন্ত্রী ছিলেন নাজমুল হাসান পাপন। উনি হয়তো সমাজোতার মাধ্যমে সমাধান করেছেন।’
এসব বিষয়ে কথা বলতে চাইলে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হতে চান না বলে উত্তর দিয়েছেন বিসিবির সিইও নিজামউদ্দিন চৌধুরী সুজন।
আর এনএসসির প্রত্যাশা, শীঘ্রই রাষ্ট্রের বকেয়া পরিশোধ করবে ক্রিকেটের সর্বোচ্চ সংস্থা।





