রাত নামলেই গ্রেপ্তারের ভয়; দেশ ছাড়ছেন মিয়ানমারের তরুণেরা

মিয়ানমারের একটি সড়ক
মিয়ানমারের একটি সড়ক | ছবি: সংগৃহীত
0

সন্ধ্যার পর ঘরের বাইরে বের হওয়া যেন বিভীষিকা দক্ষিণ মিয়ানমারের ক্যারেন প্রদেশের তরুণদের জন্য। কেননা সূর্য ডোবার পর রাস্তায় তরুণদের একা পেলেই তাদেরকে গ্রেপ্তারের অজুহাতে তুলে নিয়ে যাচ্ছে জান্তা বাহিনী। জোরপূর্বক যুক্ত করছেন সামরিক বাহিনীতে। সেনাবাহিনী আতঙ্কে তাই অনেকে বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাড়ি জমাচ্ছে প্রতিবেশী দেশ থাইল্যান্ডে। জান্তা বাহিনীর এমন কর্মকাণ্ডে নিন্দা জানিয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা।

দিনের নীল আভা শেষে সবেমাত্র রাতের অন্ধকারে ছেয়ে গেছে দক্ষিণ মিয়ানমারের কারেন প্রদেশের আকাশ। নিয়ন আলোতে রঙিন প্রদেশটির রাজধানী পা-আন। কিন্তু তরুণদের অবিরাম পদচারণায় যেখানে মুখর থাকার কথা রাস্তাঘাট, সেখানে যেন সূর্য ডুবলেই শুনশান নীরবতা।

রাস্তায় হাতে গোনা কয়েকজন তরুণ দেখা গেলেও, সবার ভেতরেই তাড়া করছে ভয়- আতঙ্ক। কোনো কারিফিউ কিংবা সামরিক হামলার ভয় নয়; রাতের অন্ধকারে জান্তা বাহিনীর কোন গাড়ি এসে যাতে কাউকে গ্রেপ্তারের নাটক সাজিয়ে তুলে নিয়ে না যায়, সেই আতঙ্কই তাড়া করছে প্রদেশটির অসংখ্য তরুণের মধ্যে।

বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে লড়াইয়ে বিপর্যস্ত এবং বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার নিন্দায় ক্লান্ত মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন জান্তা সরকার জোরপূর্বক ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণদের রাস্তা থেকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে গিয়ে যুক্ত করছে সামরিক বাহিনীতে। বেশ কয়েকমাস ধরে সেনাবাহিনীর আতঙ্কে এক প্রকার ঘরবন্দি জীবন কাটাচ্ছেন প্রদেশটির তরুণরা।

তাদেরই একজন ২৬ বছর বয়সী ট্যাক্সি ড্রাইভার জাও মিন। সন্ধ্যা নামলেই রাস্তায় গাড়ি চালাতে ভয় পান তিনি। ভয়- আতঙ্কে গোপন রাখছেন নিজের পরিচয়ও।

আরও পড়ুন:

তিনি বলেন, ‘আমার পরিবার আমাকে বারবার ফোনে সতর্ক করে যাত্রীদের বেশি দূরে নিয়ে না যেতে। এছাড়াও যাত্রী নেয়ার ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শও দেয় পরিবার।’

এছাড়াও, গেল মে মাসে ইয়াঙ্গুন থেকে মা মো সান পানের স্বামী ফিও ওয়াইকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায় সামরিক বাহিনী। এরপর তিনি অপহরণের অভিযোগে মামলা দায়ের করলেও, মেলেনি স্বামীর সন্ধান।

মা মো সান পান বলেন, ‘যদি আমার স্বামীকে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সামরিক বাহিনীতে যুক্ত করা হতো; আমি মেনে নিতাম। কিন্তু আমার স্বামীকে বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। তিনি কেমন আছেন কোথায় আছেন কিছুই জানি না।’

সেনা আতঙ্কে হাঁপিয়ে ওঠা অনেক তরুণ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাড়ি জমাচ্ছে প্রতিবেশী থাইল্যান্ডে। গেল আড়াই বছরে শুধু পা-আন শহর থেকেই ১ লাখ তরুণকে তুলে নিয়ে গেছে সামরিক বাহিনী। জান্তাদের এমন কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংগঠন।

২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অং সান সুচির নেতৃত্বাধীন এনএলডি সরকারকে হটিয়ে মিয়ানমারের ক্ষমতাভার গ্রহণ করে জান্তা সরকার। এরপর থেকে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধে লিপ্ত মিয়ানমার। এর জেরে সামরিক বাহিনীতে সদস্য সংখ্যা বাড়াতে ২০২৪ সালে নাগরিকদের সামরিক বাহিনীতে যোগদান বাধ্যতামূলক করে জান্তা সরকার।

মিয়ানমারে ১৮ থেকে ৩৫ বছরের সব পুরুষ ও ১৮ থেকে ২৭ বছরের সব নারীর কমপক্ষে ২ বছরের জন্য সামরিক বাহিনীতে যোগদান বাধ্যতামূলক। এর অমান্য করলে ৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রেখেছে জান্তা সরকার।


এফএস