খান জাহান আলী দীঘির কুমির স্থানান্তরে ৬০০ বছরের ঐতিহ্যের ইতি

বাগেরহাটের মাজারের দীঘির কুমিরটিকে স্থানান্তর করা হয়েছে
বাগেরহাটের মাজারের দীঘির কুমিরটিকে স্থানান্তর করা হয়েছে | ছবি: এখন টিভি
0

বাগেরহাটের ঐতিহাসিক খান জাহান আলী (রহ.)-এর মাজার সংলগ্ন দিঘিতে থাকা একমাত্র কুমিরটিকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। আজ (বুধবার, ৩ জুন) দুপুরে স্থানীয়দের সহায়তায় বন বিভাগের কুমির বিশেষজ্ঞরা দীঘির পূর্বপারের একটি ছোট পুকুর থেকে এই কুমিরটিকে ধরা হয়। পরে হাত-পা ও চোখ বেঁধে বন বিভাগের গাড়িতে ওঠানো হয়। গাড়িতে করে খুলনার বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে নেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।

এদিকে কুমিরটিকে উদ্ধারের জন্য এদিন সকাল থেকেই বন বিভাগসহ প্রশাসনের লোকজন মাজার এলাকায় উপস্থিত হয়। বেলা সাড়ে ১০টার দিকে দিঘির পূর্ব পাড়ে কুমিরটি দেখা মেলে। পরে তাকে ধরার কার্যক্রম শুরু হয়। ১২টার দিকে খাবারের প্রলোভন দিয়ে কুমিরটিকে আটক করে বেঁধে ফেলা হয়। কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে দীঘি থেকে তুলে গাড়িতে করে খুলনাতে নিয়ে রওনা করে বন বিভাগ।

মাজারের পাড়ে কয়েক হাজার উৎসুক জনতা হাজির হয়। মাজারের কুমিরকে শেষবারের মতো দেখার চেষ্টা করেন তারা। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে পুলিশ দর্শনার্থীদের কুমিরের কাছে পৌঁছাতে দেয়নি। দূর থেকে কুমির দেখেছেন তারা।

তিন দিন আগে কুমিরটির আক্রমণে এক শিশুর মৃত্যু হয়। পরবর্তীতে মঙ্গলবার (২ জুন) রাতে জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে জরুরী সভায় জননিরাপত্তার স্বার্থে প্রাণীটি সরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত জানানো হয়।

এদিকে কুমিরটিকে সরিয়ে নেয়ায় সস্তি প্রকাশ করেছেন স্থাণীয়রা। কুমির সরিয়ে নেয়ার পরে মাজারের প্রধান ঘাটে নির্বিঘ্নে গোসল করতে দেখা যায় দর্শনার্থী ও স্থানীয়দের।

বাগেরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোসা. আতিয়া খাতুন বলেন, ‘জননিরাপত্তার স্বার্থে মাজারের দীঘির কুমিরটি অপসারণের সিদ্ধান্ত হয়। সে অনুযায়ী খুলনার বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে নেয়া হচ্ছে প্রানিটিকে।’

কুমিরের বিষয়ের পরবর্তীতে কী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে তা পরে জানানো হবে বলেও জানান তিনি।

জানা যায়, প্রায় সাড়ে ৬০০ বছর আগে এ অঞ্চলের মানুষের সুপেয় পানির চাহিদা পূরণে মাজারের সামনে থাকা এ দীঘিটি খনন করে খান জাহান আলী (রহ.)। তখন পানির সুরক্ষায় কুমির ছাড়া হয় দীঘিতে। পুরুষটার নাম রাখেন কালা পাহাড় ও স্ত্রী কুমিরটার নাম ধলা পাহাড়।

আরও পড়ুন:

এরপর তাদের বংশধর কুমিরদের মধ্যে পুরুষকে ‘কালা পাহাড়’ আর স্ত্রী কুমিরকে ‘ধলা পাহাড়’ ডাকা হতো। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে প্রজনন না হওয়া, ঘুমের ঔষধ এবং মাছ ধরা জালে বেধে আহত হওয়ার কারণে খান জাহানের ছাড়া কুমিরগুলো মারা যেতে শুরু করে। সর্বশেষ বংশধরের মৃত্যু হয় ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে।

কিন্তু কুমির যখন আশঙ্কাজনকভাবে কমছিলো, তখন ২০০৫ সালে ভারত থেকে কয়েকটা কুমির এনে দিঘিতে ছাড়া হয়। কিন্তু এর মধ্যেও কয়েকটা মারা যায়। সর্বশেষ যে দুটো ছিলো, তার একটা ২০২৩ সালের অক্টোবরে মারা যায়। এর পর থেকে একটা কুমিরই দিঘিতে আছে।

সেটিকেও সরিয়ে নেয়ার মধ্য দিয়ে খান জাহান আলী (রহ.) এর মাজার সংলগ্ন দিঘিতে কুমিরের সাড়ে ৬০০ বছরের ইতিহাসের সমাপ্তি হলো বলে মনে করছেন অনেকে। তবে প্রশাসন বলছে উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলে আবারও কুমিরটি বা অন্য কুমির এখানে অবমুক্ত করা হবে।

তবে স্থানীয় খাদেমদের দাবি, খান জাহান আলী (রহ.) এর আমলে ছাড়া কুমিরের বংশধররা তেমন আক্রমণাত্মক ছিলো না। মূলত মাদ্রাজ থেকে আনা কুমিরগুলো আক্রমন করতে থাকে। সবশেষ সোমবার (১ জুন) রাতে ফাতেমা আক্তার নামের এক শিশুকে কুমির নিয়ে যায় এবং পরের দিন তার মরদেহ পাওয়া যায়।

এর আগে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে প্রধান ঘাটে কুমিরের আক্রমনে সেখাম আলী নামের এক বৃদ্ধ আহত হয়েছিলেন। ২০২০ সালের দিকে এক কিশোরকে আক্রমণ করেছিলো কুমির। চলতি বছরের এপ্রিলে কুমিরের আক্রমণে এক কুকুর মারা যাওয়ার ঘটনাও আলোচনায় আসে দেশজুড়ে।

এসএইচ