গ্রেপ্তারের পর জামিনে বেরিয়েই ফের সন্ত্রাস; আতঙ্কে খুলনাবাসী

খুলনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়
খুলনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় | ছবি : এখন টিভি
0

একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় উদ্বিগ্ন খুলনার জনগণ। প্রতিটি ঘটনায় মামলা হচ্ছে, গ্রেপ্তার করা হচ্ছে আসামিরা। কিন্তু গ্রেপ্তারের কিছু দিনের মাথায় আদালত থেকে জামিন নিয়ে আবারো ভয়াবহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হচ্ছে তারা। এতে ভুক্তভোগী পরিবারের প্রতি হুমকি যেমন বাড়ছে, তেমনি আসামি ধরার আগ্রহ হারাচ্ছে পুলিশ।

অপরাধ কর্মকাণ্ড, মামলা বা আসামি গ্রেপ্তার- পুলিশি এই প্রক্রিয়ার সাথে তাল মিলাতে পারছেন না আদালত। মামলায় দীর্ঘ সময় এবং প্রচলিত নীতি অনুযায়ী জামিন প্রক্রিয়া- অপরাধীদের জন্য সুযোগ তৈরি করছে।

গত ২৪ জুন খুলনায় মসজিদে ঢুকে দুই ব্যবসায়ীকে গুলি করে সন্ত্রাসীরা। এ মামলায় উঠে আসে সন্ত্রাসী আরমান হোসেনের নাম। গত বছরের ৭ মে হত্যা, আগ্নেয়াস্ত্র, দস্যুতাসহ অন্তত সাতটি মামলায় যাকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। ছয় মাস পর গত ২৮ নভেম্বর তিনি উচ্চ আদালত থেকে জামিন পান।

গত ১৯ মার্চ রাতে কৃষ্ণনগর এলাকার কাজী রাশেদের বাড়িতে ঢুকে চারজনকে গুলি করা হয়। এ মামলায় সন্ত্রাসী ইমরানসহ চারজনকে আটক করে পুলিশ। গত মে মাসে তারা জামিনে ছাড়া পান। ২ জুন বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে সন্ত্রাসীরা কুপিয়ে হত্যা করে একজনকে। ঢাকাইয়া শামীম খুলনার এনসিপি নেতা মোতালেব শিকদারকে হত্যাচেষ্টা মামলার প্রধান আসামি। গত ২৬ ডিসেম্বর তাঁকে গ্রেপ্তার করলেও ১৩ মে জামিন পান তিনি। আদালতের সামনে জোড়া খুন, ডাকবাংলোয় প্রকাশ্যে শ্রমিক নেতাকে গুলি করে হত্যাসহ বিভিন্ন চাঞ্চল্যকর মামলার আসামীরা এখন জামিন নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে প্রকাশ্যে।

স্থানীয়দের একজন বলেন, ‘এই আইনের যে বেড়াজাল সে যেখান থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। সেই জায়গাটাকে আমরা যদি একটু আন্তরিকতার সঙ্গে দেখি, তাহলে কিন্তু এইভাবে সন্ত্রাসের বেরোতে পারবে না।’

স্থানীয়দের আরেকজন বলেন, ‘প্রত্যেকের ভিতর আইনের ভীতিটা তৈরি করতে হবে। মানতে হবে আইন আসলে ভয়ের জিনিস। আমরা যদি আইনকে ছেলেখেলা ভাবি, তাহলে আমরা এখান থেকে উঠে আসতে পারবো না।’

আরও পড়ুন:

গত দেড় বছরে পুলিশের তালিকাভুক্ত ১৫ সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে হত্যা, ডাকাতি, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধে তিনটি থেকে ১৪টি পর্যন্ত মামলা থাকলেও তারা সবাই এখন জামিনে মুক্ত। আটক হওয়া সন্ত্রাসীদের আবারো অপরাধ জগতের মাঠে দেখে হতাশ পুলিশ সদস্যরা।

খুলনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘একটা আসামি ধরার জন্য আমাদের কতটা পরিশ্রম করা লাগে! দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা আসামির পেছনে পরিশ্রম করে যাই এবং প্রচুর টেকনোলজি ওখানে ব্যয় করা লাগে। সব দিক দিয়ে আসলে একটা আসামি ধরা আমাদের জন্য অনেক কষ্টসাধ্য। এরপরে আমরা কোর্টে সাবমিট করি। কোর্ট সাবমিট করার পরে যখন আবার বের হয়ে এসে একই পুনরাবৃত্তি ঘটায়, একই অপরাধ ঘটায়, তখন আসলে খুব কষ্ট লাগে।’

পুলিশের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর ৯১টি হত্যাকাণ্ড হয়েছে। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ২১টি। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মামলায় ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ৩ শতাধিক আসামীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এদের বড় অংশ জামিনে মুক্ত বলে জানান রাষ্ট্রপক্ষের এই আইনজীবী।

খুলনা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের চিফ পাবলিক প্রসিকিউটর চৌধুরী তৌহিদুর রহমান তুষার বলেন, ‘২০ কোটি লোকের জন্য ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ জন বিচারক! এইভাবে পৃথিবীর কোনো দেশে এত কম বিচারকে কোর্টে মামলা চলছে না। তাই এগুলো আসলে দ্বিগুণ-তিনগুণ করা দরকার, তা না হলে মামলা ডিলে হবে। যত চেষ্টাই আমরা করি না কেন। মামলা ডিলে হলে জামিন দিয়ে দেয়, মানে একটা টাইম আছে তার পরে জামিন দিয়ে দেয়।’

অপরাধীদের কাছে বর্তমানে মামলা ভীতির কোনো বিষয় নয়। কারণ, আদালতে আসলেই পেয়ে যাচ্ছেন জামিন, আবারো জড়াচ্ছেন নানা অপরাধে। এই অপরাধ প্রবণতা কমাতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা গুলোর আরও কঠোর হতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এফএস