আজ (শনিবার, ৩ অক্টোবর) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে পঞ্চম বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনের ‘দ্য নিউ ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক ডিজঅর্ডার: ইমপ্লিকেশনস ফর বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেশনে এসব কথা বলেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ সিপিডির চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান।
‘ফ্র্যাগমেন্টস, ফ্রন্টিয়ার্স, ফিউচারস: নেভিগেটিং পাওয়ার, টেকনোলজি অ্যান্ড ট্রাস্ট ইন এ ওয়ার্ল্ড রিরিটেন’ প্রতিপাদ্যে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ সিজিএস আয়োজিত তিন দিনব্যাপী এ সম্মেলন ৩ অক্টোবর শুরু হয়েছে।
অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, ‘দীর্ঘ সময় পর বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন একটি ব্যবস্থার উত্থান দেখা যাচ্ছে, যার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এশিয়ার দিকে অর্থনৈতিক ক্ষমতা ও প্রভাবের স্থানান্তর। পণ্য বাণিজ্যে এশিয়ার প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ায় এ অঞ্চলে বড় ধরনের অর্থনৈতিক উদ্বৃত্ত তৈরি হয়েছে।’
তার মতে, মূলধনের নতুন উৎস তৈরি হওয়ায় উন্নয়ন সহায়তা বা সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের জন্য এখন আর শুধু পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে না। ফলে তুলনামূলক ভারসাম্যপূর্ণ ও কম আধিপত্যশীল বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বাণিজ্যের ধরনও দ্রুত বদলে যাচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। আগে এশিয়ার অধিকাংশ দেশের বাণিজ্য পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে বেশি যুক্ত থাকলেও এখন এশিয়ার দেশগুলোর প্রধান বাণিজ্য অংশীদার ক্রমেই এশিয়ার মধ্যেই তৈরি হচ্ছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, বিশ্বের ১২০টি দেশের মধ্যে ৭০টির প্রধান বাণিজ্য অংশীদার এখন চীন।
আরও পড়ুন
প্রযুক্তি খাতেও এশিয়ার উত্থানের কথা তুলে ধরে রেহমান সোবহান বলেন, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে পেটেন্ট এবং গবেষণাপত্র প্রকাশ; দুই ক্ষেত্রেই চীন এগিয়ে রয়েছে। একই সঙ্গে সহায়তা, ঋণ ও বিভিন্ন ধরনের সরকারি ঋণ-সুবিধার মাধ্যমে মূলধন সরবরাহের ক্ষেত্রেও চীনের ভূমিকা বেড়েছে।’
তবে এই পরিবর্তনকে স্বাভাবিক অর্থনৈতিক রূপান্তর হিসেবে গ্রহণ না করে উন্নত দেশগুলো বাজারে হস্তক্ষেপ ও শুল্ক ব্যবস্থার মাধ্যমে মোকাবিলার চেষ্টা করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রেহমান সোবহান বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কিছু দেশ নিজেদের বাজারকে কৌশলগত সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করছে এবং প্রবেশাধিকার সীমিত করছে। শুল্কের চাপের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশকে নির্দিষ্ট পণ্য কিনতে কিংবা যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ করতে বাধ্য করার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। তার মতে, এটি স্বাভাবিক বাজারব্যবস্থার অর্থনৈতিক যুক্তির চেয়ে রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত।’
এ ধরনের নীতি যুক্তরাষ্ট্রের নিজেদের জন্যও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয় বলে মনে করেন তিনি। তার যুক্তি, কোনো দেশকে নিজের বাজারে পণ্য রপ্তানির সুযোগ দিতে বা নিজের পণ্য কিনতে বাধ্য করতে হলে বোঝা যায়, সংশ্লিষ্ট অর্থনীতি বাজার প্রতিযোগিতায় আগের অবস্থানে নেই।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ভূমিকা দুর্বল হয়ে পড়ার কথাও উল্লেখ করেন সিপিডি চেয়ারম্যান। তার মতে, নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা রক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমাগত চাপ ও ক্ষয়ের মুখে পড়ছে এবং প্রতিষ্ঠিত অনেক নিয়মও লঙ্ঘিত হচ্ছে।
আরও পড়ুন
তবে এসব পদক্ষেপ বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষমতার ভারসাম্য এশিয়ার দিকে যাওয়ার প্রক্রিয়া থামাতে পারবে না বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, এশিয়া ধীরে ধীরে বৈশ্বিক অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে। চীন ক্রয়ক্ষমতার সমতার হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে গেছে এবং ভবিষ্যতে নামমাত্র জিডিপির হিসাবেও এগিয়ে যেতে পারে। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে নতুন নতুন মূল্যশৃঙ্খলও গড়ে উঠবে।
এ পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ছে উল্লেখ করে রেহমান সোবহান বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, আঞ্চলিক অস্থিরতা এবং বিভিন্ন বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার কারণে তৈরি অর্থনৈতিক সংকট বাংলাদেশকেও মোকাবিলা করতে হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের মূল স্বার্থ অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিশ্চিত করা। দেশকে তুলনামূলক ছোট অর্থনীতি হিসেবে দেখা হলেও এ অবস্থান বাংলাদেশের জন্য নমনীয়তার সুযোগ তৈরি করে। বাংলাদেশের স্বার্থ এমন একটি স্থিতিশীল বিশ্বব্যবস্থায়, যেখানে বাইরের শক্তিগুলো এসে অর্থনৈতিক সুযোগ বাধাগ্রস্ত করতে পারবে না।’
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে বিশ্বজুড়ে নিজেদের মূল্যশৃঙ্খল শক্তিশালী করার ওপর জোর দেন তিনি। তার মতে, বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার এখনো অত্যন্ত সীমিত। বিপরীতে দেশের প্রধান আমদানি উৎস এবং ক্রমবর্ধমানভাবে মূলধনের উৎসও এশিয়া। তাই এশিয়ায় তৈরি হওয়া নতুন সুযোগের সঙ্গে বাংলাদেশের উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যবস্থাকে আরও শক্তভাবে যুক্ত করতে হবে।
আরও পড়ুন
চীন ও ভারতের মতো দুটি বড় অর্থনীতির প্রতিবেশী হওয়াকে বাংলাদেশের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করেন রেহমান সোবহান। তার মতে, আগামী এক দশকে চীন বিশ্বের বৃহত্তম এবং ভারত তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে। কিন্তু এই দুই দেশের অর্থনৈতিক উত্থানের সুযোগ বাংলাদেশ এখনো পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি।
তিনি বলেন, চীন ও ভারতের মূল্যশৃঙ্খলের সঙ্গে বাংলাদেশের উৎপাদনব্যবস্থার কিছু সংযোগ তৈরি হলেও নতুন রপ্তানি সুযোগের সঙ্গে দেশের রপ্তানি খাতকে যথেষ্টভাবে যুক্ত করা যায়নি। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বহুমুখী করার বিষয়ে পরিকল্পনা থাকলেও তা বাস্তবায়নের সক্ষমতা এখনো দুর্বল।
বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব শুধু বঙ্গোপসাগরে নয়, স্থলভাগেও রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। পদ্মা ও যমুনা সেতুসহ অবকাঠামোগত সংযোগের মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া, পশ্চিম এশিয়া এবং শেষ পর্যন্ত ইউরোপের সঙ্গে স্থলযোগাযোগের সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার (বিসিআইএম) অর্থনৈতিক করিডোর উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন রেহমান সোবহান। তিনি বলেন, এই উদ্যোগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তিনি এর সঙ্গে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছেন।
এশিয়ার ভবিষ্যতের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে ভারত ও চীনের মধ্যকার অস্বস্তিকর সম্পর্কের কথাও তুলে ধরেন তিনি। দুই দেশের শক্তিশালী অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও বাণিজ্যিক নির্ভরতার পাশাপাশি সীমান্ত বিরোধ অব্যাহত থাকাকে তিনি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি বড় বৈপরীত্য হিসেবে উল্লেখ করেন।
রেহমান সোবহানের মতে, চীন-ভারত সম্পর্ক স্থিতিশীল হলে এবং বাংলাদেশ এতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারলে তা আরও ভারসাম্যপূর্ণ আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করবে।





