কম্বল বিতরণের নামে আল-আরাফাহ ব্যাংকের ১০ কোটি টাকা লোপাট

কম্বল ও আল-আরাফাহ ব্যাংকের লোগো
কম্বল ও আল-আরাফাহ ব্যাংকের লোগো | ছবি: এখন টিভি
0

কম্বল বিতরণের নামে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন ১০ কোটি টাকা। বিপুল পরিমাণ এই অর্থ তুলে নেয়া হয়, ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত ড্রাইভার, এপিএস এবং ব্যাংকটির খাতুনগঞ্জ ব্রাঞ্চের দুইজন কর্মকর্তার মাধ্যমে। শুধু তাই নয়, আইন অমান্য করে ব্যাংকটিতে নিয়োগ দেয়া হয়েছে ২০ জনকে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে এমন তুঘলকি কাণ্ড ঘটিয়েছেন ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুস সামাদ লাবু।

কাগজে-কলমে লক্ষ্য ছিলো ‘শীতার্থদের সেবা’। আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশন থেকে ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয় কম্বল কেনার জন্য। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, এ বিশাল অংকের টাকার পুরোটাই লুটপাট করা হয়েছে সিএসআর-এর নামে। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের তোয়াক্কা না করে, তড়িঘড়ি করে মাত্র এক মাসের ব্যবধানে সরিয়ে ফেলা হয়েছে সব টাকা।

তদন্তে দেখা যায়, গত বছরের ডিসেম্বরের ১২ তারিখে ফাউন্ডেশনের নামে ব্যাংকটির গুলশান ব্রাঞ্চে খোলা হয় একটি অ্যাকাউন্ট। নতুন এ হিসাবে দেয়া হয় ১০ কোটি টাকা। এর পরপরই শুরু হয় টাকা তোলার হিড়িক। তড়িঘড়ি করে অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ তুলে নেয়ার ৩৭ দিনের মাথায় তা বন্ধও করে দেয়া হয়।

ব্যাংকের নথিপত্র বলছে, তৎকালীন চেয়ারম্যান আব্দুস সামাদ লাবুর গাড়িচালক একাই তুলেছেন ২ কোটি টাকা। আর চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা পিয়ারু তুলেছেন ৬ কোটি টাকা। বাকি ২ কোটি টাকা তোলা হয় খাতুনগঞ্জ শাখার দুই কর্মকর্তার মাধ্যমে। তবে এত টাকার কম্বল কেনা হলেও তার কোনো ভাউচার বা প্রমাণ দেখাতে পারেনি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের সাবেক এ মহাপরিচালক বলছেন, ব্যাংক খাতে আইন প্রয়োগের সংকটের কারণেই এমন সব অপকর্ম বাড়ছে। এ খাতের অনিয়ম দূর করতে আইনের কঠোর বাস্তবায়ন চান তিনি।

অর্থনীতিবিদ ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী বলেন, ‘এখন সুরাহা করতে গেলে কী করে, এটা বাংলাদেশ ব্যাংকের, এ যে রিপোর্ট করে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে যায়, বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের হয়তো বোর্ড থেকে বাদ দিয়ে দিবে। তাকে শুধু বোর্ড থেকে বাদ দেয়া না, তারা যদি ২ কোটি টাকা নিয়ে থাকে, তার জন্য ৪ কোটি টাকা বা ১০ কোটি টাকা তারা ফাইন করতে হবে। কারণ আমাদের দেশে এই সংস্কৃতিটা নাই বলেই লোকজন খালি বারবার এগুলা সাহস আপনার মানে সাহস পাচ্ছে।’

আরও পড়ুন:

এ ধরনের ঘটনা পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার জবাবদিহিতার সংকট বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ।

অর্থনীতিবিদ ড. তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘আমার মনে হয় যে একটা ওভারঅল ওভারসাইট বডি এখন করা দরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে যারা শুধুমাত্র বাইরে থেকে এই যতগুলো দুর্নীতির অভিযোগ, এটার কেস এবং এটার আইনি প্রক্রিয়াকে মনিটরিং করবে এবং এইটার ব্যাপারে একটা জবাবদিহিতা স্বচ্ছতা তৈরি করবে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ১০ কোটি টাকা বিতরণে ব্যাংকের মূল পর্ষদের কোনো অনুমোদনই ছিল না। বিষয়টিকে বড় ধরনের অনিয়ম হিসেবে চিহ্নিত করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। মুখপাত্র বলছেন, নিরীক্ষকদের সুপারিশের ভিত্তিতে নেয়া হবে কঠোর ব্যবস্থা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক ইন্সপেকশন করে যদি এ ধরনের অনিয়ম পায়; যে এখানে টাকা ব্যয় হয়েছে কিন্তু তার সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ নেই এবং যেখানে যার যার ক্ষেত্রে অনুমোদন প্রয়োজন ছিলো। যথাযথভাবে সে অনুমোদন গ্রহণ করা হয়নি, তখন বাংলাদেশ ব্যাংক অবশ্যই এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’

যে দেশে কয়েকশ টাকার একটি কম্বলের জন্য শীতের রাতে মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে, সেখানে ১০ কোটি টাকা গিলে ফেলার এমন খবর ব্যাংক খাতের চরম অব্যবস্থাপনারই বহিঃপ্রকাশ। সাধারণ গ্রাহকের প্রশ্ন—লুটপাট হওয়া এই অর্থ কি আদৌ ফেরত আসবে? নাকি তদন্তের আড়ালেই চাপা পড়ে যাবে এই বিপুল অংকের দুর্নীতি?

এফএস