বিশাল পরিসরের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, দিনের প্রথম ও শেষ খাবার গ্রহণের সময়ের সঙ্গে মৃত্যুঝুঁকির একটি সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে নিয়মিত দেরিতে নাস্তা করার সঙ্গে বিভিন্ন কারণে মৃত্যুঝুঁকি এবং হৃদরোগজনিত মৃত্যুঝুঁকি বাড়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল হেলথ অ্যান্ড নিউট্রিশন এক্সামিনেশন সার্ভের (NHANES) ১৯৯৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ৩১ হাজার ৪৪ জন প্রাপ্তবয়স্কের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষণাটি করা হয়েছে। চীনের হুয়াঝং ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির গবেষক ঝিলেই শানের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের গড়ে ৮ দশমিক ৬ বছর পর্যবেক্ষণ করা হয়। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ইউরোপিয়ান জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশনে।
নাস্তা যত দেরিতে, ঝুঁকিও তত?
গবেষণায় দিনের প্রথম ক্যালোরিযুক্ত খাবার বা পানীয় গ্রহণের সময়কে নাস্তার সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, সকাল ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে দিনের প্রথম খাবার গ্রহণকারীদের তুলনায় যারা আরও দেরিতে খাওয়া শুরু করেছেন, তাদের মৃত্যুঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
সকাল ৮টা থেকে ১০টার মধ্যে প্রথম খাবার খেলে যেকোনো কারণে মৃত্যুঝুঁকি প্রায় ১০ শতাংশ বেশি পাওয়া গেছে। সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টার মধ্যে প্রথম খাবার খেলে এ ঝুঁকি বেড়ে ১৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আর দুপুর ১২টার পর দিনের প্রথম খাবার খাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেড়েছে প্রায় ২৯ শতাংশ।
হৃদরোগজনিত মৃত্যুর ক্ষেত্রেও পার্থক্যটি আরও স্পষ্ট। সকাল ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে প্রথম খাবার গ্রহণকারীদের তুলনায় দুপুর ১২টার পর প্রথম খাবার খাওয়া ব্যক্তিদের হৃদরোগজনিত মৃত্যুঝুঁকি ৪৬ শতাংশ বেশি পাওয়া গেছে।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, ৫০ বছর বয়সে যারা নিয়মিত তুলনামূলক দেরিতে দিনের প্রথম খাবার গ্রহণ করেন, তাদের প্রত্যাশিত আয়ু গড়ে প্রায় ২ দশমিক ৪৬ বছর কম হতে পারে।
তবে গবেষণাটি খাবার দেরিতে খাওয়াকে সরাসরি মৃত্যুর একমাত্র কারণ হিসেবে প্রমাণ করে না। গবেষকেরাও এ বিষয়ে সতর্ক করেছেন।
রাতের খাবারেও সময় গুরুত্বপূর্ণ
শুধু সকালের খাবার নয়, দিনের শেষ খাবারের সময় নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। গবেষণায় রাতের খাবারের সময় ও মৃত্যুঝুঁকির সম্পর্ককে অনেকটা ‘U’ আকৃতির হিসেবে দেখা গেছে।
রাত ৭টার আগে দিনের শেষ খাবার খাওয়া ব্যক্তিদের ঝুঁকি রাত ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে খাবার শেষ করা ব্যক্তিদের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ বেশি ছিল। অন্যদিকে, রাত ১২টার পর খাবার খাওয়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেড়েছে প্রায় ২৭ শতাংশ।
গবেষণার মডেলে রাত ৮টার কাছাকাছি সময়ে দিনের শেষ খাবার শেষ করা ব্যক্তিদের ঝুঁকি সবচেয়ে কম দেখা গেছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে সবার জন্য রাত ৮টায় খাবার শেষ করাই বাধ্যতামূলক। গবেষক ঝিলেই শান মনে করেন, খাবারের সময় ব্যক্তির বয়স, শারীরিক অবস্থা, দৈনন্দিন জীবনযাপন ও ক্যালোরি গ্রহণের মতো বিভিন্ন বিষয়ের সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ খাবারের সময়?
মানবদেহ নিজের একটি নির্দিষ্ট ছন্দ মেনে চলে। এই ছন্দকে বলা হয় সারকাডিয়ান রিদম বা দেহঘড়ি। কখন ঘুমাব, কখন জাগব, কখন শরীর বেশি সক্রিয় থাকবে—এসবের পাশাপাশি খাবারের সময়ও এই জৈব ঘড়ির সঙ্গে সম্পর্কিত।
দেরিতে খাবার খাওয়ার অভ্যাস শরীরের বিপাকীয় কার্যক্রমের স্বাভাবিক ছন্দে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে গ্লুকোজ ও চর্বি বিপাকের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে বলে গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
প্রাণির ওপর পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণাতেও অসময়ে খাবার গ্রহণের সঙ্গে ওজন বৃদ্ধি, লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমা এবং বিপাকীয় কার্যক্রমে পরিবর্তনের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
তাহলে কি নাস্তা করতেই হবে?
গবেষণার ফল দেখে হঠাৎ করে জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন আনার পরামর্শ দিচ্ছেন না গবেষকেরা। কারণ, কেউ দেরিতে নাস্তা করছেন কেন—তার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। শারীরিক অসুস্থতা, কাজের সময়সূচি, ঘুমের সমস্যা কিংবা কম ক্যালোরি গ্রহণের মতো বিষয়ও এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
অর্থাৎ, দেরিতে নাস্তা করাই যে কম আয়ুর একমাত্র কারণ—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। গবেষণাটি মূলত খাবারের সময় ও স্বাস্থ্যের ফলাফলের মধ্যে একটি সম্পর্কের ইঙ্গিত দিয়েছে। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার, সুস্থ জীবনযাপনে খাবারের মানের পাশাপাশি নিয়মিত সময় মেনে খাওয়ার অভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
ঘড়ির কাঁটায়ও নজর থাক
আজকের ব্যস্ত জীবনে খাবারের সময়কে সবচেয়ে বেশি অবহেলা করা হয়। সকালে তাড়াহুড়ো করে নাস্তা বাদ দেয়া, দুপুরে দেরিতে খাওয়া কিংবা রাতে ঘুমানোর কিছুক্ষণ আগে ভারী খাবার খাওয়া—এসব অনেকের দৈনন্দিন অভ্যাস।
নতুন গবেষণার বার্তা তাই খুব সহজ—শুধু প্লেটে কী আছে, তা নয়; প্লেটটি কখন সামনে আসছে, সেদিকেও নজর দিন।
সুষম খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রমের পাশাপাশি সময় মেনে খাবার গ্রহণের অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ জীবনযাপনে সহায়ক হতে পারে। তবে ব্যক্তিভেদে প্রয়োজন ভিন্ন হওয়ায় দীর্ঘদিনের খাদ্যাভ্যাসে বড় পরিবর্তনের আগে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেয়াই নিরাপদ।
তথ্যসূত্র: সাইন্স অ্যালার্ট





