কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অস্তিত্ব সংকট: ভীতি নাকি বাণিজ্যিক কৌশল?

দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণী প্রতিবেদন

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি | ছবি: সংগৃহীত
0

গত কয়েক সপ্তাহে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ঝুঁকি নিয়ে প্রযুক্তি মহল থেকে একের পর এক চাঞ্চল্যকর দাবি উঠে এসেছে। কেউ বলছেন আগামী এক বছরের মধ্যে এআই পুরো ইন্টারনেট দখল করে নিতে পারে, কেউ আবার মানবজাতি বিলুপ্তির ১০ শতাংশ সম্ভাবনার কথা বলছেন। আবার অনেকে মনে করছেন, এ সবই বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি সুপরিকল্পিত কৌশল। দ্য গার্ডিয়ান ছয়টি প্রধান দাবি ও সেগুলোর পেছনের বাস্তবতা বিশ্লেষণ করেছে।

ইন্টারনেট দখলের ভবিষ্যদ্বাণী: কতটা বাস্তবসম্মত?

অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও অ্যামোদি গত ১২ সেপ্টেম্বর দাবি করেন, আগামী ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে এআই চালিত একটি 'বটনেট' পুরো ইন্টারনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে পারে এবং শত শত কোটি ডলারের ক্ষতি করতে সক্ষম। তবে নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির এআই বিশেষজ্ঞ গ্যারি মার্কাস এই দাবিকে অতিরঞ্জিত বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর মতে, ক্লাউডফ্লেয়ার, গুগল ও অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেসের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামো এতটাই শক্তিশালী যে কোনো এআই সহজে তা দখল করতে পারবে না।

যুক্তরাজ্যের সারে ইউনিভার্সিটির সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক অ্যালান উডওয়ার্ড জানান, ইন্টারনেটের কাঠামো এত বৈচিত্র্যময় যে কোনো বটনেট দীর্ঘমেয়াদে তা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে না। তাঁর কথায়, 'এআই নিজে থেকে এসব সিদ্ধান্ত নেবে না। মানুষই দায়ী এবং এআই একটি হাতিয়ার মাত্র। আমাদের নিয়ন্ত্রণ করতে হবে মানুষকে, এআইকে নয়।'

মানবজাতি বিলুপ্তির ১০ শতাংশ ঝুঁকি: বিজ্ঞান নাকি অনুমান?

অ্যানথ্রপিকের গবেষক ইভান হাবিঙ্গার দাবি করেছেন, আগামী এক দশকে এআই মানবজাতিকে ধ্বংস করার সম্ভাবনা ১০ শতাংশের বেশি। তবে এআই নাও ইনস্টিটিউটের প্রধান বিজ্ঞানী হেইডি খলাফ এই ধরনের সংখ্যাগত দাবিকে অবিজ্ঞানসম্মত বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন, 'এসব দাবি যাচাইযোগ্যও নয়, মিথ্যা প্রমাণযোগ্যও নয়। সুতরাং এগুলো বিজ্ঞানসম্মত নয়।'

তবে ঝুঁকি যে একেবারে নেই, তাও নয়। গত জুলাইয়ে ওপেনএআই স্বীকার করে যে তাদের এআই এজেন্টগুলো একটি নিরাপত্তা পরীক্ষার সময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল এবং পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ করে ইন্টারনেটের বিভিন্ন অংশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করেছিল। অ্যানথ্রপিকও জানিয়েছে, তাদের মডেল ব্যবহার করে জৈব অস্ত্র তৈরির পাঁচটি প্রচেষ্টা শনাক্ত করা হয়েছে।

নিয়ন্ত্রণের দাবি: সুরক্ষা নাকি একচেটিয়া বাজার?

স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক এই পুরো পরিস্থিতিকে একটি 'সাই-অপ' বা মনস্তাত্ত্বিক অপারেশন বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর ইঙ্গিত, বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি নিয়ন্ত্রণের দাবি তুলছে যাতে নতুন প্রতিদ্বন্দ্বীরা বাজারে ঢুকতে না পারে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সও একই সুরে বলেছেন, বড় বড় প্রতিষ্ঠান নিজেরাই সরকারের কাছে নিয়ন্ত্রণ চাইছে—বিষয়টি তাঁর কাছে 'ট্রোজান হর্স' মনে হচ্ছে।

তবে আধুনিক এআইয়ের অন্যতম পথিকৃৎ কানাডীয় কম্পিউটার বিজ্ঞানী ইয়োশুয়া বেঙ্গিও মনে করেন, এটি কোনো ষড়যন্ত্র নয়। তিনি বলেন, 'সরকার যদি তাদের দাবি অনুযায়ী গতি কমায়, তাহলে প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ক্ষতি হবে। শেয়ারবাজারে ট্রিলিয়ন ডলারের মূল্যায়নের মুখে এ ধরনের পদক্ষেপ তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়।'

পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়েও বড় হুমকি?

যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডেস ব্রাউন দাবি করেছেন, অতিবুদ্ধিমান এআই পারমাণবিক অস্ত্রের সমান বা তার চেয়েও বড় হুমকি তৈরি করতে পারে। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির গবেষক টবি অর্ড এই মূল্যায়নকে সঠিক বলে মনে করেন। তবে বাস্তবতা হলো, অতিবুদ্ধিমান এআই এখনো তৈরি হয়নি এবং কবে হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। র‍্যান্ড করপোরেশনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পারমাণবিক অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় কঠোর সুরক্ষা থাকায় এআই সরাসরি পারমাণবিক হামলা ঘটাতে পারবে না। তবে ভুল তথ্য ছড়িয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী মানুষকে প্রভাবিত করার ঝুঁকি থেকেই যায়।

গতি কমানোর রাজনৈতিক চাপ

মার্কিন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স অতিবুদ্ধিমান এআই তৈরির ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং উন্নত এআই গবেষণায় সাময়িক বিরতির দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই দাবিকে 'অসুস্থ ষড়যন্ত্র' বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর মতে, এআইয়ের বিকাশে কোনো বাধার প্রয়োজন নেই এবং এর সুফল ভোগ করছে কেবল চীন। প্যালান্টিরের প্রধান নির্বাহী অ্যালেক্স কার্প বলেন, 'যদি আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকত, তাহলে আমি এই প্রযুক্তি পুরোপুরি থামিয়ে দেয়ার পক্ষে থাকতাম। কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে, তাই থামানো সম্ভব নয়।'

চীন বনাম যুক্তরাষ্ট্র: প্রযুক্তির ঠান্ডা যুদ্ধ

মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট সতর্ক করে বলেছেন, এআই দৌড়ে চীন এগিয়ে গেলে আর কিছুই গুরুত্বপূর্ণ থাকবে না। তবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই উদ্বেগকে অতিরঞ্জিত বলে উড়িয়ে দিয়েছে। তাদের ভাষায়, 'ভীতি ছড়ানো, সংঘাত ও অশুভ প্রতিযোগিতা কেবল বৈশ্বিক এআই শাসনব্যবস্থাকেই ব্যাহত করবে।'

বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, চীন-হুমকির এই বয়ানের পেছনে বাণিজ্যিক স্বার্থও রয়েছে। চীনের উন্মুক্ত ও বিনামূল্যের এআই মডেলগুলো এখন ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের মডেলগুলোর প্রায় সমান সক্ষম। এই ওপেন সোর্স মডেলগুলো বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

এআই প্রযুক্তির ঝুঁকি নিয়ে বিতর্ক এখনো চলমান। একদিকে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বাস্তব ঝুঁকির কথা বলছেন, অন্যদিকে সমালোচকরা মনে করছেন এই ভীতি ছড়ানোর পেছনে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ জড়িত। নিশ্চিতভাবে বলা যায়, এআই প্রযুক্তির বিকাশ যে গতিতে হচ্ছে, তার নিয়ন্ত্রণ ও নৈতিক কাঠামো তৈরি এখন বিশ্বনেতাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি।

এএম