তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘ওই দ্বীপে মার্কিন সেনারা ‘‘সহজ লক্ষ্যবস্তুতে’’ পরিণত হতে পারে।’ প্রকাশ্যে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান দেখালেও পর্দার আড়ালে পরিস্থিতি উঠে এসেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, একটি মার্কিন এফ-১৫ই বিমান ভূপাতিত হওয়ার খবর শুনে ট্রাম্প কয়েক ঘণ্টা ধরে সহযোগীদের ওপর চিৎকার করেন। পরিস্থিতি সামলাতে সহযোগীরা তাকে ‘সিচুয়েশন রুম’ থেকেও দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন।
গতকাল (শনিবার, ১৮ এপ্রিল) প্রকাশিত ওই দীর্ঘ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে রণক্ষেত্রে মার্কিন সেনাদের নিরাপত্তা এবং কূটনৈতিক চাল নিয়ে ট্রাম্পের বিচিত্র সব সিদ্ধান্তের কথা।
‘ইউরোপীয়রা সাহায্য করছে না’
প্রতিবেদনে বলা হয়, যখন ট্রাম্পকে জানানো হয় যে একটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়েছে এবং দুজন বৈমানিক নিখোঁজ, তখন তিনি প্রচণ্ড ক্ষোভে ফেটে পড়েন। তিনি বারবার চিৎকার করে বলতে থাকেন, ‘ইউরোপীয়রা আমাদের কোনো সাহায্য করছে না।’
নিখোঁজ বৈমানিকদের উদ্ধারে তিনি অবিলম্বে স্থল সেনা পাঠানোর দাবি জানান। কিন্তু কর্মকর্তারা তাকে মনে করিয়ে দেন যে, ১৯৭৯ সালের পর থেকে ইরানের মাটিতে মার্কিন বাহিনীর কোনো স্থল অভিযান নেই।
উদ্ধার অভিযানের প্রতি মুহূর্তের আপডেট দেয়ার সময় সহযোগীরা ট্রাম্পকে সিচুয়েশন রুমের বাইরে রাখেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ক্যাম্প ডেভিড থেকে এবং চিফ অব স্টাফ সুজি ওয়াইলস ফ্লোরিডার বাড়ি থেকে ফোনে যুক্ত থাকলেও ট্রাম্পকে কেবল বিশেষ মুহূর্তগুলোতে ব্রিফ করা হতো। সহযোগীদের ধারণা ছিল, ওই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের ‘অধৈর্য্য আচরণ’ কোনো কাজে আসবে না।
পরে দুই বৈমানিককেই উদ্ধার করা সম্ভব হয়। এ সময় ট্রাম্প ১৯৭৯ সালের ইরান জিম্মি সংকটের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘জিমি কার্টারের সময় যা ঘটেছিল, তা তাদের নির্বাচন হারার কারণ ছিল। কী এক জঘন্য অবস্থা!’
খার্গ দ্বীপ অভিযানে অস্বীকৃতি
ইরানের তেল রপ্তানির ৯০ শতাংশই হয় খার্গ দ্বীপ থেকে। সামরিক কর্মকর্তারা ট্রাম্পকে জানিয়েছিলেন, এই দ্বীপটি দখল করতে পারলে হরমুজ প্রণালির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আসবে এবং অভিযানটি সফল হবে। কিন্তু ট্রাম্প এতে সরাসরি না করে দেন। তার আশঙ্কা ছিল, এতে প্রচুর মার্কিন সেনা হতাহত হতে পারে।
ট্রাম্প বলেন, ‘ওরা ওখানে ‘সিটিং ডাকস’ (সহজ লক্ষ্যবস্তু) হয়ে পড়বে।’ জনসমক্ষে আক্রমণাত্মক ভাবমূর্তি দেখালেও আড়ালে ট্রাম্প যুদ্ধের ভয়াবহতা নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইস্টার সকালে ‘আল্লাহর প্রশংসা’ এবং ট্রাম্পের কৌশল
দ্বিতীয় বৈমানিক উদ্ধারের খবর পাওয়ার পর ইস্টার উৎসবের সকালে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বিতর্কিত পোস্ট করেন। সেখানে তিনি হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়ার দাবি জানান এবং ‘সব প্রশংসা আল্লাহর’ শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করেন। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানায়, এই পোস্টটি ছিল সম্পূর্ণ ট্রাম্পের নিজস্ব পরিকল্পনা।
পরে এক উপদেষ্টার প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘তিনি নিজেকে যতটা সম্ভব আপত্তিকর হিসেবে উপস্থাপন করতে চেয়েছিলেন, যাতে ইরানীরা আলোচনার টেবিলে আসতে বাধ্য হয়। তার মতে, ‘এই ভাষাই ইরানীরা বুঝবে।’
রিপাবলিকান সিনেটর এবং খ্রিষ্টান ধর্মীয় নেতারা এই পোস্ট নিয়ে আপত্তি জানালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্ক রুবিও ব্যক্তিগতভাবে জানান, এই ভাষা হয়তো ইরানীদের আলোচনায় আনতে সহায়তা করতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার ট্রাম্প ১২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়ে ইরানকে ধ্বংস করার যে হুমকি দিয়েছিলেন, তাও কোনো জাতীয় নিরাপত্তা পরিকল্পনার অংশ ছিল না। বরং ট্রাম্প মরিয়া হয়ে এ যুদ্ধ শেষ করতে চেয়েছিলেন বলেই এমন কৌশল নিয়েছিলেন। আল্টিমেটামের সময় শেষ হওয়ার ৯০ মিনিট আগে তিনি দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন।





