গত রোববার ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প এটিকে একটি ‘মানবিক পদক্ষেপ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘এই জাহাজ চলাচলের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো এমন সব মানুষ, কোম্পানি ও দেশকে মুক্ত করা, যারা কোনো ভুল করেনি। তারা নিছক পরিস্থিতির শিকার।’ আটকে পড়া জাহাজগুলোর দেশগুলোর অনুরোধেই এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। ইরানের সঙ্গে মার্কিন দূতেরা ‘ইতিবাচক’ আলোচনা করছেন জানালেও ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, এই অভিযানে কোনো ধরনের বাধা দেয়া হলে তা ‘কঠোরভাবে মোকাবিলা’ করা হবে।
তবে এই অভিযান কীভাবে পরিচালিত হবে, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। সোমবার অভিযান শুরুর প্রথম দিনেই ওমান ও ইরানের মধ্যবর্তী জাস্ক এলাকার কাছে একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি করেছে ইরানি নৌবাহিনী। যুক্তরাষ্ট্র এই দাবি অস্বীকার করলেও ঘটনাটি সংঘাত আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার কয়েক দিনের মাথায় হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেয় তেহরান। যুদ্ধ এবং প্রণালিটিতে অচলাবস্থার কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। অন্যদিকে ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে। গত ৮ এপ্রিল থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের মাধ্যমে এখনো কোনো বৃহত্তর চুক্তিতে পৌঁছাতে পারেনি তেহরান ও ওয়াশিংটন।
আরও পড়ুন:
ইরান এই সংঘাতের স্থায়ী অবসান চায়। অন্যদিকে ট্রাম্পের দাবি, প্রথমে হরমুজ প্রণালি থেকে অবরোধ প্রত্যাহার করতে হবে। প্রণালিটি দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি তেল ও গ্যাস রপ্তানি হয়। ট্রাম্প আরও স্পষ্ট করেছেন যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এখনো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমা।
আটকে পড়া জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এই অভিযানে সহায়তা করবে। সেন্টকম জানিয়েছে, এই উদ্যোগে ডেস্ট্রয়ার যুদ্ধজাহাজ, শতাধিক উড়োজাহাজ, চালকবিহীন জলযান এবং প্রায় ১৫ হাজার সেনাসদস্য মোতায়েন করা হতে পারে।
মার্কিন মেরিন কোরের সাবেক বিশেষ অভিযান বিশেষজ্ঞ জোনাথন হ্যাকেট বলেন, সংঘাতের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য ছিল সরকার পতন ও পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করা। কিন্তু এখন সেই লক্ষ্য কেবল হরমুজ প্রণালি ও অর্থনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘সাগরে কোনো সংঘাত শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্রকে শুধু জাহাজ পাহারা দিলেই চলবে না, রক্ষাও করতে হবে। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এই মুহূর্তে মাত্র ডজনখানেক উপযুক্ত জাহাজ রয়েছে, যেখানে যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন ১০০টির বেশি জাহাজ এই প্রণালি পার হতো।
ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) হিসাব অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালির কাছে উপসাগরে প্রায় ২ হাজার জাহাজে ২০ হাজার নাবিক আটকা পড়েছেন। এর মধ্যে তেল ও গ্যাস ট্যাঙ্কার, কার্গো এবং প্রমোদতরিও রয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে জাহাজের ওপর অন্তত ১৯টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে ১০ জন নাবিক নিহত এবং ৮ জন আহত হয়েছেন। অনেক জাহাজে খাবার, জ্বালানি ও সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
আরও পড়ুন:
অন্যদিকে ইরান জোর দিয়ে বলেছে, প্রণালি অতিক্রমকারী জাহাজগুলোকে অবশ্যই টোল দিতে হবে এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কর্পস (আইআরজিসি) অনুমোদিত পথ অনুসরণ করতে হবে। ট্রাম্পের ঘোষণার পর ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের প্রধান ইব্রাহিম আজিজি এক্সে বলেন, ‘ট্রাম্পের বিভ্রান্তিকর পোস্ট দিয়ে হরমুজ প্রণালি ও পারস্য উপসাগর পরিচালিত হবে না।’ যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো হস্তক্ষেপ যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
মার্কিন নৌবাহিনী প্রণালিতে মাইন অপসারণের কাজ শুরু করেছে। তবে পুরো এলাকা নিরাপদ করতে কয়েক সপ্তাহ থেকে মাসখানেক সময় লাগতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের ফাস্ট-অ্যাটাক বোট ও সামুদ্রিক মাইনের ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। মার্কিন নৌ-বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা হারলান উলম্যান বলেন, ‘ইরান যদি জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেয়, তবে এটি আলোচনার জন্য ইতিবাচক পদক্ষেপ হতে পারে। কিন্তু ইরান বাধা দিলে পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়ংকর রূপ নেবে।’
হরমুজ প্রণালির এই উত্তেজনার সঙ্গে ১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়কার ‘ট্যাঙ্কার ওয়ার’ বা ট্যাঙ্কার যুদ্ধের মিল পাওয়া যায়। ওই সময় কুয়েতি ট্যাঙ্কারগুলোকে সুরক্ষা দিতে যুক্তরাষ্ট্র ‘অপারেশন আর্নেস্ট উইল’ শুরু করেছিল। পরে ১৯৮৮ সালে একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইরানের মাইনে ক্ষতিগ্রস্ত হলে ‘অপারেশন প্রেইং ম্যানটিস’ নামে ইরানি নৌবাহিনীর ওপর বড় ধরনের হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র।





