একই দিন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র সামরিক পর্যায় শেষ হয়েছে। এখন ওয়াশিংটন ভবিষ্যতের আলোচনার জন্য একটি ‘সমঝোতা স্মারক’ (এমওইউ) চাইছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ঠিক এই দাবিটিই করে আসছিল ইরান।
পাকিস্তানের মাধ্যমে পাঠানো প্রস্তাবে তেহরান শুরু থেকেই ধাপে ধাপে আলোচনার কথা বলে আসছে। তাদের দাবি ছিল—প্রথমে যুদ্ধ বন্ধের চুক্তি হবে, এরপর ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধের বিষয়ে আলোচনা হবে। তবে ট্রাম্প প্রশাসন আগে এ বিষয়ে ঘোর বিরোধী ছিল। তাদের দাবি ছিল, চুক্তির মূল শর্তই হতে হবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বাতিল। কিন্তু এখন বিশ্লেষকেরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো ইরানের সেই শর্ত মেনেই এগোচ্ছে।
রয়টার্স ও অ্যাক্সিওস বুধবার জানিয়েছে, যুদ্ধ বন্ধে এক পৃষ্ঠার একটি সমঝোতা স্মারকের কাছাকাছি পৌঁছেছে দুই দেশ, যদিও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে এখনো কোনো বিস্তারিত আলোচনা হয়নি। তেহরানভিত্তিক বিশ্লেষক সাইয়েদ মোজতবা জালালজাদেহ মনে করেন, ওয়াশিংটন শেষ পর্যন্ত বাস্তবসম্মত একটি পথে হাঁটছে। তিনি বলেন, ‘সমঝোতা স্মারকের দিকে এগিয়ে যাওয়া আশু সংকট সমাধানে একটি কার্যকর ও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।’
পাকিস্তান সরকারের মধ্যস্থতায় এই শান্তি আলোচনা সম্প্রতি আরও গতি পেয়েছে। তবে এর আগে গত কয়েক দিনে সংঘাত বাড়ার লক্ষণ দেখা গিয়েছিল। ইরান সংযুক্ত আরব আমিরাতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে, যা ৮ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর প্রথম বড় ঘটনা। দুই পক্ষই একে অপরের জাহাজে হামলার দাবি করলেও ওয়াশিংটন উত্তেজনা বাড়াতে চায়নি। মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা এটিকে ‘বড় যুদ্ধ শুরু হওয়ার মতো ঘটনা নয়’ বলে এড়িয়ে যান।
মূল প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র কি ইরানের সেই মূল শর্তটি মেনে নিয়েছে ? পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিওর মঙ্গলবারের ব্রিফিং থেকে এমনটিই ইঙ্গিত মেলে। শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য ছিল ইরানের নৌ ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করা এবং পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন ঠেকানো। কিন্তু এখন তারা কেবল আলোচনার শর্ত ঠিক করতে একটি সমঝোতা স্মারকের কথা বলছে। রুবিও দাবি করেছেন, মার্কিন সামরিক অভিযান ইরানের ‘প্রচলিত সামরিক ঢাল’ ধ্বংস করেছে, যার আড়ালে তারা পারমাণবিক কর্মসূচি চালাত। বিশ্লেষকদের মতে, এটি মূলত যুদ্ধের উদ্দেশ্যকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা।
তেহরানও এই পরিবর্তন খেয়াল করেছে। রোববার ট্রাম্প যখন ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ শুরু করেন, তখন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছিলেন, রাজনৈতিক সংকটের কোনো সামরিক সমাধান নেই। এর ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই অভিযানটি স্থগিত হয়। কিংস কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ বলেন, ‘ওয়াশিংটন বুঝতে পেরেছে যে যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালি এবং পারমাণবিক বিষয়গুলো একসঙ্গে সমাধান করা সম্ভব নয়। এটি তেহরানের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক ছাড়।’
তবে দুই পক্ষের মধ্যে এখনো বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে। ইরান গত ৩০ এপ্রিল যে ১৪ দফার প্রস্তাব দিয়েছিল, তাতে ৩০ দিনের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধ, নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং ইরানের জব্দ করা অর্থ ছাড়ের কথা বলা হয়েছে। পারমাণবিক আলোচনার বিষয়টি পরে রাখা হয়েছে। তবে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এখনো কোনো ঐকমত্য হয়নি। রুবিও স্পষ্ট করেছেন, ইরানকে প্রণালি দিয়ে যাওয়ার জন্য টোল দিতে হবে—এমন কোনো শর্ত যুক্তরাষ্ট্র মানবে না। অন্যদিকে ইরান এই জলপথের জন্য নতুন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালুর দাবি করছে।
এরই মধ্যে বুধবার বেইজিংয়ে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-র সঙ্গে বৈঠক করেছেন আব্বাস আরাঘচি। আগামী ১৪-১৫ মে ট্রাম্পের চীন সফরের আগেই এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো। এছাড়া আগামী ২৫ মে থেকে হজে অংশ নিতে লাখ লাখ মানুষ সৌদি আরবে জড়ো হবেন। এই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে কোনো সংঘাত রাজনৈতিকভাবে মারাত্মক হতে পারে। বিশ্লেষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ মনে করেন, এই সময়সীমার কারণে ছোট কোনো চুক্তির সম্ভাবনা বাড়লেও একটি বড় ও দীর্ঘস্থায়ী চুক্তির সম্ভাবনা কম।





