মার্কিন কূটনীতি: কাবুল থেকে তেহরান, মিত্রদের উপেক্ষা করার নতুন ধারা

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, মার্কো রুবিও, জেডি ভ্যান্স
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, মার্কো রুবিও, জেডি ভ্যান্স | ছবি: আল জাজিরা
0

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কূটনীতির ধরন মিত্রদের জন্য কতটা অস্বস্তিকর হতে পারে, তা আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহারের সময় থেকেই স্পষ্ট হয়েছিল। এখন ইরানের সঙ্গে সংঘাতের সময় সেই একই নীতি আগ্রাসী রূপে ধরা দিচ্ছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইলকে সঙ্গে নিয়ে ইরানে মার্কিন হামলার পর হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যায়। এই হামলায় সমর্থন না দেয়ায় ন্যাটো মিত্রদের, বিশেষ করে স্পেনকে প্রকাশ্যেই হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। এমনকি স্পেনকে ন্যাটো থেকে বের করে দেয়ার বিষয়টিও তার বিবেচনায় রয়েছে বলে খবর বেরিয়েছে। মিডল আইয়ের বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

অনেকেই মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসনের এই ‘একলা চলো’ বা লেনদেনভিত্তিক কূটনীতি একটি নতুন ঘটনা। কিন্তু আসলে এই নীতির গোড়াপত্তন হয়েছিল আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের সময়। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে যাদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছে, সেই শত্রুদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা এবং মিত্রদের এড়িয়ে চলার এই মার্কিন প্রবণতা আফগানিস্তানেই প্রথম সাধারণ বিষয় হয়ে ওঠে।

‘শ্যাডোজ ওভার কাবুল’ বইয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, ট্রাম্প প্রশাসন যখন তালেবানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা শুরু করে, তখন কাবুলের নির্বাচিত সরকারকে একেবারেই কোণঠাসা করে রাখা হয়। ২০১৮ সালে জালমে খলিলজাদকে বিশেষ দূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর তিনি সরাসরি তালেবানের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। ট্রাম্প প্রশাসন শুধু নিজেদের প্রত্যাহারকেই গুরুত্ব দিয়েছিল, মিত্র সরকার কী ভাবছে, তার পরোয়া করেনি।

২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে কাতারের দোহায় যখন যুক্তরাষ্ট্র ও তালেবানের মধ্যে চুক্তি সই হয়, তখন কাবুলের সরকার সেই চুক্তির চূড়ান্ত খসড়াও দেখতে পায়নি। এই চুক্তির আওতায় ৫ হাজার তালেবান বন্দিকে মুক্তি দিতে বাধ্য করা হয় প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানিকে। মুক্তি পাওয়া এই বন্দিদের অনেকেই পরে ভয়াবহ সব হামলায় যুক্ত হন। তৎকালীন আফগান জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হামদুল্লাহ মোহিবের মতে, ‘আমাদের অবজ্ঞা করা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বার্তা দেয়া হয়েছিল যে কাবুলের সরকার আর যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় অংশীদার নয়।’

আরও পড়ুন:

আফগান প্রশাসন আশা করেছিল জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট হলে এই নীতির পরিবর্তন হবে। কিন্তু বাইডেন উল্টো প্রত্যাহারের গতি বাড়িয়ে দেন। এতে আফগান সেনাবাহিনী আকাশ সহায়তার অভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তালেবান একে একে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে থাকে। কাবুলের পতনের পর বাইডেনের বিশৃঙ্খল প্রত্যাহার নীতি গোটা বিশ্বে মার্কিন নির্ভরতার প্রতি প্রশ্ন তুলে দেয়।

আফগানিস্তানে দেখা গেছে যুক্তরাষ্ট্র যখন পিছু হটে, তখন তাদের লেনদেনভিত্তিক কূটনীতি মিত্রদের কীভাবে বলি দেয়। আর এখন ইরানের সঙ্গে সংঘাতে বোঝা যাচ্ছে, আগ্রাসনের সময় এই নীতি কতটা ভয়ংকর হতে পারে। দুই ক্ষেত্রেই একটা বিষয় স্পষ্ট—যৌথ কৌশলের চেয়ে ওয়াশিংটনের তাৎক্ষণিক লক্ষ্যই তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলকে সমর্থন দিতে গিয়ে অন্য মিত্রদের এড়িয়ে চলা বা তাদের ওপর ক্ষুব্ধ হওয়ার এই মার্কিন নীতি বিশ্ব কূটনীতিতে বড় ধরনের ফাটল তৈরি করছে। একটি বিচ্ছিন্ন দেশ এমন করলে হয়তো বড় কোনো সমস্যা হতো না, কিন্তু একটি পারমাণবিক পরাশক্তি যখন এমন আচরণ করে, তখন তার পরিণতি গোটা বিশ্বকেই ভোগ করতে হয়।

এএম