পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী তার বিজয়ী ভাষণে বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘ভবানীপুরে সিপিএমের ১৩ হাজার ভোট ছিল, যার মধ্যে অন্তত ১০ হাজার আমার কাছে এসেছে। সেখানকার সিপিএম ভোটারদের প্রতিও আমার কৃতজ্ঞতা রইলো।’
নিউ ব্যারাকপুর এলাকার সিপিএম কর্মী সঞ্জিৎ রায় বলেন, ‘আমাদের দল যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল না। তাই আমাদের অনেক সমর্থক তৃণমূলকে হঠাতে বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন।’ শুধু ভবানীপুর নয়, দমদম উত্তরসহ রাজ্যের অনেক বিধানসভা আসনেই এই ভোট স্থানান্তরের ঘটনা ঘটেছে।
বাম ভোটাররা কবে থেকে বিজেপির দিকে ঝুঁকতে শুরু করলেন, তার সূত্রপাত ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে। সেবার ব্যাপক সহিংসতা ও ভয়ভীতির মধ্যে তৃণমূলের হাতে বহু বাম কর্মী হামলার শিকার হন ও প্রাণ হারান। এরপর থেকেই বহু বাম ভোটার তৃণমূলকে নিজেদের প্রধান শত্রু মনে করতে শুরু করেন।
এর স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায় ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে। সেবার বাম দলগুলো একটি আসনও পায়নি। তাদের ভোটের হার ৩০ শতাংশ থেকে ৮ শতাংশের নিচে নেমে আসে। বিপরীতে বিজেপির আসন ২ থেকে বেড়ে ১৮ হয় এবং ভোটের হার ১৭ থেকে একলাফে ৪০ শতাংশে ওঠে।
কলকাতার আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোহাম্মদ রেয়াজ মনে করেন, ২০১৬ সালে তৃণমূলের বিশাল জয়ের পর বাম কর্মীরা বুঝতে পারেন, তাদের দল আর কার্যকর বিরোধী শক্তি হিসেবে দাঁড়াতে পারছে না। তখন থেকেই হিন্দু বাম ভোটারদের একটি বড় অংশ বিজেপিকে শ্রেয় বিকল্প ভাবতে শুরু করেন।
কলকাতার লেখক ও গবেষক স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য জানান, বাম দলগুলো তাদের অর্ধেকের বেশি ভোটার হারিয়েছে, যার বেশির ভাগই বিজেপিতে গেছে। এখনো এই ভোটারদের ২২ শতাংশ তারা ফিরে পেতে পারেনি।
এবারের নির্বাচনে ২৯৪ আসনের মধ্যে ২০৭টি জিতে প্রায় ৪৫ শতাংশ ভোট পেয়েছে বিজেপি। বিশ্লেষকদের মতে, শুধু নিজস্ব ভোটব্যাংক দিয়ে বিজেপির পক্ষে এত বড় জয় পাওয়া সম্ভব ছিল না। তৃণমূলবিরোধী ক্ষোভের ঢেউয়ে বাম ভোটারদের একটি বড় অংশ সরাসরি বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন।
তবে কেবল বাম ভোটারদের কারণেই বিজেপি জিতেছে, এমনটা বলাও অতিসরলীকরণ হবে। নারী ভোটারদের একটি অংশের বিজেপির দিকে ঝোঁক এবং ক্ষমতাসীন তৃণমূলের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ক্ষোভও এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে বড় ভূমিকা রেখেছে।
এ ছাড়া ভারতের কেন্দ্রীয় আধাসামরিক বাহিনীর (সিএপিএফ) ব্যাপক উপস্থিতিও ভোটে বড় প্রভাব ফেলেছে। সিপিএম কর্মী সঞ্জিৎ রায়ের মতে, তৃণমূল নেতারা আগে প্রতিটি নির্বাচনে ভয় ও সহিংসতার পরিবেশ তৈরি করতেন। এবার কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিশাল উপস্থিতিতে ভোটাররা নির্ভয়ে ভোট দিতে পেরেছেন।
বিজেপির এই জয়ের পর পশ্চিমবঙ্গজুড়ে বামপন্থীরা দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূলের দখলে থাকা তাদের পুরোনো দলীয় কার্যালয়গুলো পুনরুদ্ধার করতে শুরু করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে বেশ কিছু ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে।
তবে বাম শিবিরের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। এক বাম সমর্থক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘বিজেপি তাদের বিরুদ্ধে কোনো উল্লেখযোগ্য বিরোধী শক্তি গড়ে উঠতে দেবে কি না, তা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে।’ এরপরও বাম দলগুলো নিজেদের সংগঠন টিকিয়ে রেখেছে। এখন তাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো, তৃণমূলের পতনের পর সৃষ্ট বিরোধী শূন্যস্থান পূরণ করে নিজেদের হারানো অবস্থান পুনরুদ্ধার করা।





