বিশ্বজুড়ে বাড়ছে সমুদ্র দূষণ; হুমকিতে সামুদ্রিক প্রাণী ও মানবজীবন

সমুদ্র পাড়ে ময়লার স্তূপ
সমুদ্র পাড়ে ময়লার স্তূপ | ছবি: সংগৃহীত
0

প্লাস্টিক, আবর্জনা ও তেল নিঃসরণে প্রতিদিনই দূষিত হচ্ছে সমুদ্রের পানি। গবেষণা বলছে, চলতি বছরের প্রথমার্ধেই বৈশ্বিক দূষণের কবলে পড়েছে সাগর মহাসাগর। কলম্বিয়ার পর্যটন শহর সান্তা মার্তার সৈকত এরইমধ্যে পরিণত হয়েছে আবর্জনার স্তূপে। বসনিয়ার দ্রিনা নদীর ওপর ভাসছে ময়লা আবর্জনা। মেক্সিকো, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, রাশিয়া এমনকি ওমানেও ছড়িয়ে পড়েছে দূষণের কালো থাবা। যা প্রভাব ফেলছে সমুদ্রের প্রাণীসহ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ওপরও।

এটি কলম্বিয়ার সান্তা মার্তা শহরের সৈকতের দৃশ্য। ভারী বৃষ্টি ও প্রচণ্ড ঢেউয়ের তোড়ে সমুদ্রে ভেসে আসে আবর্জনার স্তূপ। প্লাস্টিকের ব্যাগ, বোতল, পুরানো টায়ার, ভাঙা আসবাবপত্র এমনকি শিশুদের জুতা, এমনকি কুকুরের মরদেহ। আবর্জনায় ঢেকে গেছে প্রায় গোটা উপকূল।

এক অধিবাসী বলেন, ‘এটা সত্যিই দুঃখজনক। কিন্তু এটা সমুদ্র বা প্রকৃতির কাজ নয়, পুরোটাই মানুষের করা। আমরাই এ অবস্থার সৃষ্টি করছি।’

মূলত মানজানারেস নদী দিয়ে বর্জ্যগুলো উপসাগরে এসে জমা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো বছরের পর বছর সচেতনতা গড়ে তুললেও দূষণ কমছেই না। সান্তা মার্তার মতো পর্যটন কেন্দ্র এখন পরিণত হয়েছে আবর্জনার ভাগাড়ে। এতে একদিকে হতাশ পর্যটকরা, তেমনি স্থানীয় মৎস্যজীবীরা পড়েছেন চরম বিপাকে।

অন্যদিকে, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার দ্রিনা নদীর ছবি দেখলে মনে হবে যেন এতে পানি নেই, কেবল আবর্জনা। প্লাস্টিকের বোতল, ড্রাম, ব্যারেল, গাছের ডাল – সব মিলে নদীর বুকে ভাসমান বর্জ্যের বিশাল এক স্তর।

আরেকজন বলেন, ‘আশপাশের অবৈধ ডাম্প থেকেই প্রতি বছর বৃষ্টি ও তুষার গলার সময় এই আবর্জনা এসে জমে। এটি আন্তর্জাতিক সমস্যা- যামন্টিনিগ্রো, সার্বিয়া হয়ে বসনিয়া পর্যন্ত ছড়ায় এ দূষণ।’

মেক্সিকোর অবস্থা আরও ভয়াবহ। ভেরাক্রুজ রাজ্যের সৈকত ছেয়ে গেছে দূষিত তেলে। নষ্ট হচ্ছে পানি, হুমকির মুখে পড়ছে সমুদ্রের প্রাণীকুল। দূষণের কারণে মাছ শিকারও প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে জেলেদের।

এক জেলে বলেন, ‘জেলেরা এখন মাছ ধরতে পারছে না। কারণ সমুদ্র ও উপকূলে অপরিশোধিত তেল। অনেক জাল নষ্ট হয়ে গেছে। আমরা থামতে পারি না, এখান থেকেই আমাদের জীবিকা।’

এদিকে ইন্দোনেশিয়ার বালির কেদোংগানান সৈকত চেনার উপায় নেই। সমুদ্রের ঢেউ ও মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে সৈকতজুড়ে তৈরি হয়েছে প্লাস্টিকের বোতল, কাঠ, বাঁশের স্তূপ। এক অধিবাসী বলেন, ‘এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক যে জোয়ার এত আবর্জনা নিয়ে আসছে। এতে পর্যটন খাত শেষ হয়ে যাবে।’

ভারতের রাজধানী দিল্লির যমুনা নদীর দূষণের চিত্র আরও করুণ। বিষাক্ত ফেনায় ঢেকে গেছে নদী। আর এর কারণ অবৈধ শিল্প বর্জ্য ও অপরিশোধিত নর্দমার পানি। সরকারি উদ্যোগের পরও নদী দূষণ দিন দিন বেড়েই চলেছে।

এদিকে জ্বালানি দূষণ পৌঁছে গেছে রাশিয়া পর্যন্ত। ১৭ এপ্রিল ইউক্রেনের ড্রোন হামলার পর রাশিয়ার তুয়াপসে বন্দরে তেল ছড়িয়ে পড়ে। স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যায়, কৃষ্ণ সাগরের উপকূলে গাঢ় কালো তেলের স্তর। আপাতত তেল শোধনাগারটি বন্ধ রয়েছে।

ইরানে ৬-৮ মে স্যাটেলাইট ছবিতে ধরা পড়ে তেল নিঃসরণের আরেক ঘটনা। খার্গ দ্বীপের কাছে প্রায় ৪৫ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ধূসর ও সাদা আস্তরণ দেখা যায়।

শুধু তেল বা আবর্জনা নয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও ঘটেছে রাসায়নিক দুর্যোগের আশঙ্কা। ২৫ মে লস অ্যাঞ্জেলেস শহরতলীর গার্ডেন গ্রোভের হাজার হাজার বাসিন্দাকে সরানোর নির্দেশ দেয়া হয়। পার্শ্ববর্তী একটি রাসায়নিক ট্যাঙ্ক ত্রুটিপূর্ণ হয়ে বাতাসে বিষাক্ত বাষ্প ছাড়াতে পারে এমন শঙ্কা থেকে আসে এ নির্দেশ।

কলম্বিয়ার সৈকত থেকে বসনিয়ার নদী, মেক্সিকোর উপকূল থেকে ভারতের যমুনা, ইন্দোনেশিয়ার পর্যটন কেন্দ্র থেকে যুক্তরাষ্ট্রের শহরতলি–বিশ্বের সর্বত্রই দূষণ ও পরিবেশ দুর্যোগ যেন নিত্যদিনের ঘটনা। শিল্প বর্জ্য, অপরিশোধিত তেল, রাসায়নিক দুর্ঘটনা–সব মিলিয়ে এক ভয়াবহ চিত্র। বিশেষজ্ঞরা বলছেন এমন পরিস্থিতি সামাল দিতে দরকার আন্তর্জাতিক সমন্বয়, কঠোর আইন ও জনসচেতনতা।

এএইচ