গতকাল (বুধবার, ১৭ জুন) নাটকীয় এক বক্তব্যে ট্রাম্প একই সঙ্গে ইরানকে নতুন করে হামলার হুমকি দিয়েছেন, আবার বেসামরিক ব্যবহারের জন্য তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মৌলিক অধিকারের কথাও স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, তেহরানকে ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বন্ধে চাপ দেবেন না এবং আটকে রাখা ইরানি সম্পদের কয়েক বিলিয়ন ডলার যুক্তরাষ্ট্র ‘ফেরত দিতে বাধ্য হবে’।
গতকাল (বুধবার, ১৭ জুন) তেহরান থেকে এই চুক্তিতে সই করেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় একটি আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এই চুক্তিতে সই করবেন। হিজবুল্লাহ প্রধান নাঈম কাসেম এই চুক্তিকে ‘বড় বিজয়’ বলে অভিহিত করেছেন। ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেন, ‘এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতার একটি দলিল।’
চুক্তির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে ট্রাম্প বলেন, কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইরানের ওপর তার মতো এতটা কঠোর ছিলেন না। ‘বাজারের চেয়ে বুদ্ধিমান আর কিছু নেই, আর বাজার এটি পছন্দ করেছে,’ বলেন তিনি। তার মতে, ‘বিকল্প পথটি ছিল বিশ্বব্যাপী একটি মন্দা।’ যুক্তি দিয়ে তিনি বলেন, চুক্তি না হলে হরমুজ প্রণালি কখনোই খুলতো না। কারণ, কেউ রকেট ও মাইনের মধ্যে বিলিয়ন ডলারের জাহাজ চালাতে রাজি হতো না। প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মতে, এই চুক্তি ইরানকে পরমাণু অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখতে সহায়ক হবে। এতে ইরানের ৪৪০ কেজি উচ্চ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে দেশের ভেতরেই আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তত্ত্বাবধানে পাতলা বা ‘ডাউন-ব্লেন্ড’ করার আলোচনা চলবে।
মূলত এটি একটি ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি চুক্তি, যার মাধ্যমে আরও বিস্তৃত পরমাণু ও স্থায়ী শান্তি আলোচনার পথ তৈরি হবে। ১৪ দফার এই পরিকল্পনায় ইরানের জন্য বড় ধরনের আর্থিক প্রণোদনা রয়েছে। এর মধ্যে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর থেকে অবিলম্বে মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার এবং অপরিশোধিত তেল রপ্তানির ওপর ছাড় অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, আটকে থাকা বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ছাড় এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থায়নে ইরানের জন্য ৩০০ বিলিয়ন (৩০ হাজার কোটি) ডলারের একটি পুনর্গঠন তহবিল গঠনের পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে ট্রাম্প স্পষ্ট করেছেন, এই ৩০০ বিলিয়ন ডলারে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অংশীদারত্ব থাকবে না। তিনি বলেন, ‘আমরা ১০ সেন্টও দিচ্ছি না।’
যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে ইরানের অন্যতম প্রধান শর্ত লেবাননও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, যা ইসরাইলকে সেখানে সামরিক অভিযান চালানো থেকে বিরত রাখবে। এতে লেবাননের ‘ভৌগোলিক অখণ্ডতা’ রক্ষার একটি ধারাও যুক্ত আছে। তবে এর অর্থ ইসরাইলকে লেবাননের ‘বাফার জোন’ থেকে সরে আসতে হবে কি না, সে বিষয়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তারা স্পষ্ট কিছু বলেননি। বিনিময়ে ইরান হিজবুল্লাহসহ তার বিদেশি মিত্রদের নিয়ন্ত্রণ করবে এবং পরমাণু অস্ত্র তৈরি বা সংগ্রহ না করার বিষয়টি পুনর্নিশ্চিত করেছে।
চুক্তি অনুযায়ী ৬০ দিনের জন্য হরমুজ প্রণালি দিয়ে শুল্কমুক্ত জাহাজ চলাচলের সুযোগ থাকলেও গতকাল (বুধবার, ১৭ জুন) গালিবাফ জানান, এই সময়ের পর জাহাজগুলোর কাছ থেকে ‘সেবা প্রদানের ফি’ আদায় করা হবে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরবে না।’ ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক পরিচালক সুজান ম্যালোনি বলেন, ‘ইরানিদের জন্য এত বেশি সুবিধা একসঙ্গে দেয়া হয়েছে যে, তারা খুব দ্রুত প্রচুর অর্থ আয় করবে। এটি প্রায় অবিশ্বাস্য।’
এদিকে জি-৭ নেতারা এই চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে তারা ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণে একটি ফলো-অন চুক্তির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন। যদিও ট্রাম্প ক্ষেপণাস্ত্র ইস্যুতে নমনীয় সুরে বলেন, ‘অন্যদের যেহেতু আছে, তাদেরও কিছু থাকতে হবে। সৌদি আরবকে ক্ষেপণাস্ত্র রাখতে দেব আর তাদের নিষেধ করবো—এমনটা হতে পারে না।’ ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এটিকে ‘খুব ভালো চুক্তি’ বলে অভিহিত করেছেন।
তবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রক্সি বাহিনী নিয়ে ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে নতুন আলোচনার প্রস্তাব তেহরান প্রত্যাখ্যান করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ট্রাম্প আরও জানান, জব্দকৃত ইরানি সম্পদ ফেরত দিতে হবে। তার ভাষায়, ‘এটি আমাদের অর্থ নয়, এটি তাদের অর্থ। যদি আমরা এটি ফেরত না দিই, তবে কেউ আর কখনো ডলারে বিনিয়োগ করবে না।’





