তবে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক আলাপে মার্কিন কর্মকর্তাদের দেয়া নতুন তথ্যে নিশ্চিত হওয়া গেছে, একটি ব্যাপকভিত্তিক ও চূড়ান্ত শান্তি চুক্তিতে পৌঁছাতে দুই দেশকে এখনো অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হবে। এই চুক্তির মাধ্যমে ট্রাম্পের প্রধান লক্ষ্য হলো, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে চিরতরে বিরত রাখা।
ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেছেন, এই চুক্তি নিশ্চিত করে যে ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র কিনবে না, তৈরি করবে না বা উৎপাদন করবে না। কিন্তু ফোনালাপে কর্মকর্তারা চুক্তির যে খসড়া বা বিবরণ পড়ে শুনিয়েছেন, তাতে এসব লক্ষ্যের ঘাটতি রয়েছে।
উল্টো যুদ্ধবিরতি বৃদ্ধির ফলে একটি স্থায়ী পারমাণবিক চুক্তিতে পৌঁছাতে দুই চিরশত্রু দেশের জন্য ৬০ দিনের এক চরম অনিশ্চিত দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে। ২০১৫ সালে মূল ইরান পারমাণবিক চুক্তিতে পৌঁছাতে ওবামা প্রশাসনের ২০ মাস সময় লেগেছিল। ট্রাম্প প্রশাসন কি মাত্র দুই মাসে তা করতে পারবে?
আপাতত চুক্তির বিবরণ অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তত্ত্বাবধানে ইরানকে কেবল তাদের মজুত করা উচ্চ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মাত্রা কমানোর বা ‘ডাউনব্লেন্ডিং’ করার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এটিকে ইরানের পক্ষ থেকে একটি ‘তাৎপর্যপূর্ণ ছাড়’ বলে উল্লেখ করেছেন।
তবে শুক্রবার নির্ধারিত স্বাক্ষরের পর শুরু হওয়া ৬০ দিনের আলোচনার সময়সীমায় এটি কীভাবে এবং কোন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ঘটবে, তার সব কারিগরি খুঁটিনাটি অবশ্যই চূড়ান্ত করতে হবে।
ট্রাম্প আরও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে কোনো অর্থ দেবে না। এটি মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যিনি ২০১৬ সালে ইরানকে ওবামা প্রশাসনের দেয়া ১৭০ কোটি (১.৭ বিলিয়ন) ডলারের সমালোচনা করে আসছেন। নিজের রাজনৈতিক সাফল্যের কথা মাথায় রেখে ট্রাম্প তার ইরান চুক্তিকে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার চুক্তির চেয়ে উন্নত হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন। এছাড়া তেহরানের বিরুদ্ধে তিনি যে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন, তা প্রমাণ করতে অর্থের বিষয়টিকে তিনি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন।
তবে এই চুক্তির বিবরণ অনুযায়ী, ইরানের পুনর্গঠনে অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি ‘সুনির্দিষ্ট ও পারস্পরিকভাবে সম্মত পরিকল্পনা তৈরি করতে আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে’ কাজ করবে যুক্তরাষ্ট্র।
যুক্তরাষ্ট্রের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই চুক্তিতে ইরানকে এক পয়সাও দেয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা যুক্তরাষ্ট্রের নেই। কিন্তু চুক্তির প্রকৃত ভাষা কিছুটা অস্পষ্ট এবং মনে হচ্ছে এটি যুদ্ধ নিরসনে আলোচনার অংশ হিসেবে চূড়ান্ত পর্যায়ে ইরানকে কিছু অর্থ দেয়ার পথ খোলা রেখেছে।
এটি ট্রাম্প এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক সমস্যা হতে পারে, যারা নতুন করে কোনো ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ’ শুরু না করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনী প্রচার চালিয়েছিলেন। হস্তক্ষেপবিরোধী ‘মাগা’ সমর্থকেরা এই ব্যবস্থা নিয়ে আপত্তি তুলতে পারেন, এমনকি ইরানকে দেয়া চূড়ান্ত অর্থ সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র থেকে না এলেও।
ট্রাম্পের নিজ রাজনৈতিক দলের ভেতর থেকেও ইতিমধ্যে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। চুক্তির বিষয়ে এবং এর সঙ্গে জড়িত অনিশ্চয়তা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে ব্রিফিং ও তথ্য দাবি করছেন কংগ্রেসের আইনপ্রণেতারা। কিছু রিপাবলিকান নেতা চুক্তিটি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। একজন বিশিষ্ট রিপাবলিকান সিনেটর এর নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, ‘ট্রাম্প ইরানকে অনেক বেশি ছাড় দিয়েছেন, কিন্তু বিনিময়ে পর্যাপ্ত কিছু পাননি।’
লুইজিয়ানার বিদায়ী সিনেটর বিল ক্যাসিডি, যিনি ট্রাম্প-সমর্থিত এক প্রার্থীর কাছে প্রাইমারি নির্বাচনে হেরে গেছেন, তিনি এক্স-এ (সাবেক টুইটার) এক পোস্টে বলেন, ‘ইরানের পারমাণবিক আকাঙ্ক্ষা দমন করা হয়নি এবং তারা শিখেছে যে হরমুজ প্রণালিতে হুমকি দেয়াটা কাজে দেয়। ভবিষ্যতে তারা নিঃসন্দেহে এটিকে কাজে লাগাবে।’ এই রিপাবলিকান নেতা আরও বলেন, ‘এটি কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ বৈদেশিক নীতির ভুল।’
দেড় পৃষ্ঠার এই চুক্তিতে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোও খুব একটা গুরুত্ব পায়নি। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ট্রাম্প বলেছিলেন, এই অঞ্চলে হিজবুল্লাহর মতো ছায়াগোষ্ঠীগুলোকে ইরানের অর্থায়ন থেকে বিরত রাখাই প্রধান অগ্রাধিকার। ইসরাইলের জন্যও এটি একটি অগ্রাধিকার ছিল, যারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধে যোগ দিয়েছিল এবং লেবাননে ইরান-সমর্থিত এই মিলিশিয়া গোষ্ঠীর সঙ্গে আলাদা সংঘাতে জড়িয়েছে।
এই প্রাথমিক চুক্তির অধীনে শত্রুতা বন্ধের বিষয়টি হিজবুল্লাহ পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছে। তবে চুক্তিতে দলটির আর কোনো উল্লেখ নেই এবং পরবর্তী ধাপের আলোচনায় ইরানকে এই গোষ্ঠী ও অন্যান্য আঞ্চলিক ছায়াদলের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করতে চাপ দেয়া হবে কি না, তা অস্পষ্ট।
বুধবার প্রকাশিত চুক্তির খসড়া বিবরণে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির বিষয়েও বিস্তারিত কিছু বলা হয়নি। অথচ যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্প ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু এটিকে অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
চলতি সপ্তাহে জেনেভায় স্বাক্ষরিত চুক্তিটি কোনো চূড়ান্ত চুক্তির দিকে নিয়ে যাবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। খসড়ায় উভয় পক্ষকে ৬০ দিনের সময়সীমা দেয়া হয়েছে, তবে প্রয়োজন হলে এটি বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, দুই দেশই একটি ব্যাপকভিত্তিক চুক্তি করার বিষয়ে খুব একটা আশাবাদী নয়।
জি-৭ সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প নিজেও ইরানের সঙ্গে স্থায়ী শান্তির সম্ভাবনার বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেননি। তিনি বলেন, ‘যদি ৬০ দিনের মধ্যে এটি সম্পন্ন না হয়, তবে ঠিক আছে। আমরা আবারও বোমা হামলায় ফিরে যাবো।’
—বিবিসির প্রতিবেদন অবলম্বনে





