ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে নিখোঁজ প্রায় ৫০ হাজার: রয়টার্স

ভূমিকম্পে ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপে জীবিতদের খুঁজছেন এল সালভাদরের উদ্ধারকর্মীরা
ভূমিকম্পে ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপে জীবিতদের খুঁজছেন এল সালভাদরের উদ্ধারকর্মীরা |
0

দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পের পর ৫০ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। প্রিয়জনের খোঁজে রাজধানী কারাকাস ও আশপাশের এলাকার হাসপাতাল, মর্গ ও অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে আহাজারি করছেন স্বজনেরা। গতকাল (শুক্রবার, ২৬ জুন) আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বুধবার সন্ধ্যায় আঘাত হানা ভূমিকম্পে এ পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৯২০-এ দাঁড়িয়েছে। আহত হয়েছেন আরও ৩ হাজার ৩৬০ জন। বিধ্বস্ত ভবনগুলোর ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো ১৭২ জন আটকা পড়ে রয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে দেশটির সরকার। তবে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ায় চূড়ান্ত প্রাণহানি অনেক বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। গতকাল বিকেলে নতুন করে ৪ দশমিক ৯ মাত্রার একটি পরবর্তী কম্পন (আফটারশক) অনুভূত হয়। এতে কারাকাস ও পার্শ্ববর্তী মারাকাই শহরের মানুষের মধ্যে আরও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

বিপুলসংখ্যক মানুষ নিখোঁজ থাকার মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত লা গুয়াইরা রাজ্যে ত্রাণ কার্যক্রমের ধীরগতি নিয়ে চরম ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। ভারী যন্ত্রপাতির অভাব ও সরকারি উপস্থিতি সীমিত থাকায় স্বেচ্ছাসেবক ও স্থানীয়রা খালি হাতেই ধ্বংসস্তূপ সরাচ্ছেন। লা গুয়াইরা শহরের আট তলাবিশিষ্ট হুগো শ্যাভেজ হাউজিং কমপ্লেক্সের ধ্বংসস্তূপে আটকা পড়েছেন জেনিফার পালাসিওর ছয় বছর বয়সি ছেলেসহ পরিবারের আরও পাঁচ সদস্য। তিনি বলেন, ‘মানুষকে জীবিত উদ্ধার করছে স্থানীয় কমিউনিটিই। কংক্রিটের চাঙর সরানোর জন্য আমাদের ক্রেন দরকার। এখনো অনেকে আটকা পড়ে আছেন।’

উপকূলীয় শহর কারাবালেদার বাসিন্দা ৭৩ বছর বয়সি আইনজীবী রিকার্ডো ত্রিয়াসও স্বজন হারানোর কষ্টে ভেঙে পড়েছেন। তার ৫৪ বছর বয়সি ধর্ম-সন্তান আরমান্দো লোপেজের মরদেহ ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা হলেও সেটি ঘটনাস্থলেই পড়ে রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা মরদেহটি ফেরত চাই। এটি এখানে পচে যাচ্ছে অথচ কোনো ফরেনসিক কর্তৃপক্ষ আসেনি।’ অন্যদিকে লা গুয়াইরার কাতিয়া লা মার শহরে ক্ষতিগ্রস্ত একটি দোকান থেকে মানুষজনকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য লুট করে নিতে দেখা গেছে। পুলিশ বা ন্যাশনাল গার্ড এই লুটপাট ঠেকাতে কোনো ভূমিকা রাখেনি।

আরও পড়ুন:

জাতিসংঘের প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার এই দুই ভূমিকম্পে সরাসরি ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ৬৭০ কোটি ডলার (প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা)। গত এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে এটিই ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প। এই দুর্যোগ ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার পর ক্ষমতায় আসেন তিনি। শুক্রবার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট রদ্রিগেজ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে ফোনে কথা বলেন।

দীর্ঘদিনের বৈরিতা ভুলে এই মানবিক বিপর্যয়ে ভেনেজুয়েলার পাশে দাঁড়িয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। বৃহস্পতিবার রাত থেকেই বিদেশি উদ্ধারকারী দলগুলো ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ১৫ কোটি ডলারের সহায়তার পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার ঘোষণা দিয়েছে এবং উদ্ধার অভিযানে দুটি জাহাজ, হেলিকপ্টার ও বিমান পাঠিয়েছে। লস কোরালেস এলাকায় এল সালভাদরের ৫০ সদস্যের একটি দল ড্রোন, তাপীয় স্ক্যানার ও কুকুরের সাহায্যে জীবিতদের খুঁজছে। দলটির প্রধান রবার্তো গাভিদিয়া বলেন, ‘মানুষজন জানিয়েছেন তারা ভেতরে আটকা পড়াদের কণ্ঠ শুনতে পাচ্ছেন। ফোনে কল করলে তারা সাড়াও দিচ্ছেন।’ এল সালভাদরের প্রেসিডেন্ট নায়িব বুকেলে এক্সে একটি ভিডিও পোস্টে জানিয়েছেন, তারা একটি ভবনের নবম তলায় তার পোষা প্রাণীসহ আটকা পড়া এক ১৫ বছর বয়সি কিশোরীকে উদ্ধার করতে কাজ করছেন।

ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভে (ইউএসজিএস) আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, চূড়ান্ত মৃতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়াতে পারে। তেমনটি হলে এটি হবে গত শতাব্দীতে লাতিন আমেরিকার অন্যতম প্রাণঘাতী ভূমিকম্প। জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থা জানিয়েছে, এই দুর্যোগে দেশটির প্রায় ৭০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।

এএম