‘অস্তিত্বহীন জলবায়ুর’ অবকাঠামো সংকট; রেকর্ড তাপদাহে ফ্রান্সে অন্তত ১ হাজারের মৃত্যু

লুক্সেমবার্গ গার্ডেনে ছাতার নিচে আশ্রয় নিয়েছেন এক ব্যক্তি
লুক্সেমবার্গ গার্ডেনে ছাতার নিচে আশ্রয় নিয়েছেন এক ব্যক্তি | ছবি: সংগৃহীত
0

ইউরোপজুড়ে চলমান রেকর্ডভাঙা তাপদাহে ফ্রান্সে অন্তত ১ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। দেশটির জনস্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, মৃতদের বেশিরভাগই বয়স্ক। তবে আবাসিক সেবা কেন্দ্র ও ব্যক্তিগত বাড়িগুলো থেকে আরও তথ্য আসার পর নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। রয়টার্স ও ল্য মঁদ ডট এফআরের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

২০ জুন থেকে শুরু হওয়া এই তাপদাহকে বিজ্ঞানীরা ইউরোপের ইতিহাসে এযাবৎকালের ভয়াবহতম বলে বর্ণনা করেছেন। আজ (রোববার, ২৮ জুন) জার্মানি, পোল্যান্ড ও ইতালিতে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি বা তার ওপরে থাকার পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। ইতালির পো নদী শুকিয়ে যাওয়ায় সমুদ্রের লোনা পানি ১৮ কিলোমিটার পর্যন্ত ভেতরে ঢুকে পড়েছে। তীব্র গরমে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়েছে।

অস্তিত্বহীন জলবায়ুর অবকাঠামো

বিজ্ঞানীরা বলছেন, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন ছাড়া এই ধরনের তাপদাহ ‘প্রায় অসম্ভব’ ছিল। ফ্রান্সের বর্তমান অবকাঠামোগুলো এমন এক জলবায়ুর কথা বিবেচনা করে তৈরি করা হয়েছিল, যার অস্তিত্ব এখন আর নেই। দেশটির বিশেষজ্ঞ ও নীতি-নির্ধারকরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাড়তে থাকা তীব্র তাপদাহ মোকাবিলায় ফ্রান্সের প্রস্তুতি ও অবকাঠামো এখন অপর্যাপ্ত। বর্তমানের রেকর্ডভাঙা তাপদাহ প্রমাণ করছে যে, শুধু সতর্কতা সংকেত দিয়ে ক্রমবর্ধমান এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় সামাল দেয়া সম্ভব নয়; বরং নগরায়ন ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা জরুরি।

২০০৩ সালের মর্মান্তিক স্মৃতি

বর্তমানের এই সংকট ২০০৩ সালের আগস্টের সেই মর্মান্তিক স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে। সে সময় এক সপ্তাহের তীব্র গরমে ফ্রান্সে প্রায় ১৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল, যার মধ্যে ৮৭ শতাংশই ছিল ৭০ বছরের বেশি বয়সী। ওই সময় সরকারের মন্ত্রীরা ছুটিতে থাকায় পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল। হাসপাতাল ও মর্গে লাশের ভিড় সামলাতে হিমশিম খেতে হয়েছিল কর্তৃপক্ষকে।

তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাঁ-ফ্রাঁসোয়া মাত্তেই-এর একটি ভিডিও বার্তা সেই সংকটের প্রতীক হয়ে আছে। মন্ত্রী যখন নিজের বাসভবনের বাগান থেকে সাধারণ পোশাকে সাক্ষাৎকার দিচ্ছিলেন, তখন চিকিৎসকেরা জরুরি বিভাগে উপচে পড়া ভিড় নিয়ে হাহাকার করছিলেন। এই ঘটনা ফরাসি রাজনীতিতে বড় ধরনের বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল এবং তৎকালীন সরকারকে ‘নিষ্ক্রিয় ও স্থবির’ বলে অভিযুক্ত করা হয়েছিল।

যদিও ২০০৩ সালের সেই ‘স্বাস্থ্যগত ধাক্কা’ দেশটির সতর্কতা ব্যবস্থা ও তাপ-সম্পর্কিত অসুস্থতা ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন এনেছে, কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত পরিবর্তন আনতে ফ্রান্স এখনো ব্যর্থ। বর্তমান তাপদাহের প্রভাব প্রশমিত হতে শুরু করলেও ফরাসি স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্টেফানি রিস্ট জানিয়েছেন, আবহাওয়া ঠান্ডা হওয়ার পরও এই বিপর্যয়ের রেশ আরও অন্তত ১০ দিন থাকতে পারে।

এএম