প্রথম ১৩টি উপনিবেশ নিয়ে যাত্রা শুরু করা যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড ছিল ৪ লাখ ৩০ হাজার বর্গমাইল। বর্তমানে তা প্রায় ৮ গুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭ লাখ বর্গমাইলে। ১৭৯০ সালের প্রথম মার্কিন আদমশুমারিতে দাসসহ জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৪০ লাখ। ২০২৫ সালে এসে তা দাঁড়িয়েছে ৩৪ কোটি ৩০ লাখে—যা প্রায় ৮ হাজার ৪৭৫ শতাংশ বৃদ্ধি।
বোস্টন কলেজের ইতিহাসের অধ্যাপক হেদার কক্স রিচার্ডসন বলেন, ‘প্রতিষ্ঠাতাদের কাছে আজকের যুক্তরাষ্ট্র প্রায় অচেনা মনে হলেও এর সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বিভাজনগুলো তাদের কাছে পরিচিত ঠেকতো।’ তার মতে, ট্রাম্পের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিগুলো হচ্ছে অভিবাসন সীমিত করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা ও ভূখণ্ড বাড়ানো—আসলে দেশের প্রাচীনতম বিভাজনেরই প্রতিফলন।
১৮০৩ সালে ফ্রান্সের কাছ থেকে লুইজিয়ানা অঞ্চল কিনে নেয়ার পর দেশটির আয়তন প্রায় দ্বিগুণ হয়। ১৮১২ সালে ব্রিটেনের সঙ্গে যুদ্ধের সময় দেশটি টিকে থাকবে কি না, তা নিয়েও সংশয় ছিল। রিচার্ডসনের মতে, ‘যারা তখন উপনিবেশগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিল, তারা ভাবতো এদের নিজেদের ভেতরেই ভেঙে পড়ার অপেক্ষায় থাকলেই হবে।’
সালভি রেজিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যাশনহুড ল্যাবের পরিচালক কলিন উডার্ড যুক্তরাষ্ট্রকে কয়েকটি স্বতন্ত্র পরিচয়ে ভাগ করেন। উত্তরের অঞ্চল, যাকে তিনি ‘ইয়াংকিল্যান্ড’ বলেন, ‘ইউরোপে ধর্মীয় নিপীড়ন থেকে পালিয়ে আসা পিউরিটান বসতি স্থাপনকারীদের গোড়াপত্তন।’ মধ্যাঞ্চলে ‘গ্রেটার আপালাচিয়া’ গড়ে উঠেছে স্বাধীনচেতা স্কট ও আইরিশদের হাতে, যারা সরকারি কর্তৃত্বকে সন্দেহের চোখে দেখতেন। অন্যদিকে দক্ষিণাঞ্চলে ছিল ভূস্বামী শ্রেণির প্রাধান্য, যারা ‘উপর থেকে নিচে চাপিয়ে দেয়া অলিগার্ক সমাজ’ গড়ে তুলেছিলেন।
বিদেশ থেকে আসা মানুষের সংস্কৃতির সংঘাতে যখন আমেরিকান পরিচয় গড়ে উঠছিল, তখন প্রথম শতকজুড়ে চলে এই ভূখণ্ডে বসবাসকারী আদিবাসীদের সংস্কৃতি মুছে দেয়ার সংগঠিত প্রয়াস। পশ্চিমমুখী সম্প্রসারণের সঙ্গে জন্ম নেয় ‘ম্যানিফেস্ট ডেসটিনি’র মতাদর্শ। কেউ কেউ বিশ্বাস করতেন, প্রশান্ত মহাসাগর পেরিয়ে পশ্চিম গোলার্ধ পর্যন্ত সম্প্রসারণ যুক্তরাষ্ট্রের নিয়তি।
আজকের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনি মানচিত্রে এই বিভাজন স্পষ্ট। রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত ‘লাল অঙ্গরাজ্য’ ও ডেমোক্র্যাটদের ‘নীল অঙ্গরাজ্য’। উত্তর-পূর্ব ও পশ্চিম উপকূল উদারনৈতিক দুর্গ হিসেবে পরিচিত, আর টেক্সাস থেকে ফ্লোরিডা পর্যন্ত দক্ষিণাঞ্চল ও অভ্যন্তরীণ পশ্চিমাঞ্চল রিপাবলিকান রক্ষণশীলতার ঘাঁটি।
উনিশ শতকের শেষদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভৌগোলিক সম্প্রসারণ থেমে গেলেও অভিবাসনের ঢেউয়ে জনসংখ্যা বাড়তে থাকে। রিচার্ডসন বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রে যা কিছু আছে, তার মধ্যে অভিবাসন অন্যতম। আমাদের সবাইকে যা যুক্ত করে, তা হলো এই বিশ্বাস—আমরা যে ভবিষ্যৎ চাই, তা গড়তে পারি।’
১৮৪০ থেকে ১৮৮৯ সাল পর্যন্ত প্রথম পর্যায়ে প্রধানত উত্তর ও পশ্চিম ইউরোপ থেকে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে আসেন। এরপর ১৮৯০ থেকে ১৯২০-এর দশক পর্যন্ত দক্ষিণ ও পূর্ব ইউরোপ থেকে আসেন আরও ১ কোটি ৮০ লাখেরও বেশি। প্রতিটি ঢেউয়ের পরই কর্মসংস্থান হারানোর আশঙ্কায় তৈরি হয় বিরূপ প্রতিক্রিয়া। এরপর আসে ‘চাইনিজ এক্সক্লুশন অ্যাক্ট’-এর মতো কঠোর আইন। ১৯২৪ সালের অভিবাসন আইন এতটাই কড়াকড়ি এনেছিল যে, যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির চার্টে তা স্পষ্ট দাগ ফেলে দেয়।
১৯৬০-এর দশকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার পর থেকে ৭ কোটির বেশি অভিবাসী যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছেন, যাদের অনেকেই এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার। শুধু মেক্সিকো থেকেই এসেছেন প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষ। মাইগ্রেশন পলিসি ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার ১৪ দশমিক ৮ শতাংশই বিদেশে জন্মগ্রহণকারী যা ১৮৯০ সালের ঐতিহাসিক সর্বোচ্চের সমান। মোট জনসংখ্যা বৃদ্ধির ৮৪ শতাংশই এসেছে অভিবাসন থেকে।
উডার্ডের মতে, প্রাথমিক ঢেউগুলো আমেরিকার উত্তরাঞ্চলের রাজনৈতিক ক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করেছিল। এই ভৌগোলিক ভারসাম্যহীনতাই মতাদর্শিক বিভাজনকে আরও উসকে দেয়। দক্ষিণের নেতারা জাতীয় রাজনীতিতে ক্ষমতা ধরে রাখতে ভূখণ্ড ও ক্রীতদাসপ্রথা সম্প্রসারণের চাপ দিতে থাকেন, যার পরিণতিতে শুরু হয় গৃহযুদ্ধ।
কিন্তু আধুনিক প্রবণতা এই ভৌগোলিক বিভাজনকে উল্টে দিয়েছে। অনেক অভিবাসী ও উত্তরাঞ্চলের বাসিন্দা এখন দক্ষিণে, বিশেষ করে টেক্সাস ও ফ্লোরিডার প্রাণবন্ত শহরগুলোয় ঝুঁকছেন। অন্যদিকে দক্ষিণ সীমান্তে অবৈধ অভিবাসনের ঢেউ উত্তেজনা বাড়িয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটেই ট্রাম্পের জনতুষ্টিবাদী রক্ষণশীলতা যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার পরিবর্তনশীল কেন্দ্রগুলোর প্রতিক্রিয়া হিসেবেই দেখা যেতে পারে। হোয়াইট হাউসে ফিরে ট্রাম্প নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী গণহারে বহিষ্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু করেছেন। একই সঙ্গে তিনি উনিশ শতকের ভূখণ্ড সম্প্রসারণের প্রতি নস্টালজিক মনোভাব দেখিয়েছেন। গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণ, পানামা খাল পুনরুদ্ধার এবং কানাডা ও ভেনেজুয়েলাকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘৫১তম অঙ্গরাজ্য’ বানানোর কথাও বলছেন তিনি।
ট্রাম্পের এই সম্প্রসারণবাদ যেন গত ২৫০ বছরের ইতিহাসের এক প্রতিবিম্ব। প্রথম শতাব্দীতে যুক্তরাষ্ট্র শারীরিকভাবে বাড়তে থাকে, এরপর ভূখণ্ড অর্জনের চেষ্টা বন্ধ করে অভিবাসীদের জন্য দেশের দুয়ার খুলে দেয়। এখন ট্রাম্প সেই ধারা বদলে ফের ভূখণ্ড সম্প্রসারণ এবং অভিবাসন সীমিতকরণের দিকে ঝুঁকছেন।
ট্রাম্প ও তার সমর্থকদের দাবি, আমেরিকান জাতির চরিত্র মৌলিকভাবে ও স্থায়ীভাবে বদলে যাওয়ার হুমকিতে রয়েছে। ‘আমাদের আর কোনো দেশ থাকবে না’ গণ অভিবাসনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রাম্পের এটি একটি প্রচলিত বক্তব্য।
উডার্ড বলেন, ‘এটি আকাশ থেকে আসেনি। আমেরিকার ইতিহাসে আমাদের সেই বৃহত্তর সংগ্রাম আমরা কি এমন একটি নাগরিক জাতি, যেখানে প্রতিটি মানুষ সমান, সর্বজনীন ও দীর্ঘমেয়াদে স্বাধীন থাকবে? নাকি এটি এমন একটি রাষ্ট্র, যা রক্ত ও বংশপরিচয়ের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট কিছু মানুষের যারা প্রকৃত আমেরিকান হাতে থাকবে?’ বিশ্ব ইতিহাসের বিশাল বিস্তারে ২৫০ বছর একটি চোখের পলক মাত্র। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই ২৫০ বছর ছিল রূপান্তরের যদিও এর কেন্দ্রে থাকা বিভাজন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ চিরস্থায়ী বৈশিষ্ট্য হয়েই রয়ে গেছে।





