প্রথমবার যুদ্ধে সি-ড্রোন ব্যবহার যুক্তরাষ্ট্রের; নিশানায় ইরানের বন্দর আব্বাস নৌঘাঁটি

প্রথমবারের মতো যুদ্ধে চালকবিহীন জলযান বা সি-ড্রোন ব্যবহারের ভিডিও প্রকাশ করেছে ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড
প্রথমবারের মতো যুদ্ধে চালকবিহীন জলযান বা সি-ড্রোন ব্যবহারের ভিডিও প্রকাশ করেছে ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড | ছবি: সিবিএস
0

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো যুদ্ধে চালকবিহীন জলযান বা সি-ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, গত সোমবার ইরানের বন্দর আব্বাস নৌঘাঁটিতে একটি সাবমেরিন ও জাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ স্থাপনায় তিনটি একমুখী ‘কোরসায়ার’ সি-ড্রোন দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে। নৌযুদ্ধের ক্ষেত্রে এটি একটি বড় মাইলফলক। আনাদোলুর প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

সেন্টকম জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোতে হামলা চালানোর ক্ষেত্রে ইরানের সক্ষমতা দুর্বল করে দেয়াই এই অভিযানের মূল লক্ষ্য।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে কৃষ্ণসাগরে সি-ড্রোনের ব্যবহার বাড়তে থাকার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ অভিযানেও স্বয়ংক্রিয় সামুদ্রিক হামলা ব্যবস্থার অভিষেক হল। এর আগে মার্কিন সামরিক বাহিনীর এসব চালকবিহীন জলযান মূলত নজরদারি, সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও উদ্ধার তৎপরতার মতো কাজে ব্যবহার করা হতো।

যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসভিত্তিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান সারোনিক এই স্বয়ংক্রিয় জলযান কোরসায়ার তৈরি করেছে। সারোনিকের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, প্রায় ২৪ ফুট (৭.৩ মিটার) লম্বা এই জলযান ১ হাজার নটিক্যাল মাইলের বেশি পথ পাড়ি দিতে পারে। এর গতিবেগ ৩৫ নটের বেশি এবং এটি প্রায় ১ হাজার পাউন্ড (৪৫৩ কেজি) সরঞ্জাম বা বিস্ফোরক বহন করতে সক্ষম। মানুষের ন্যূনতম হস্তক্ষেপ ছাড়াই এটি গুপ্তচরবৃত্তি, রসদ সরবরাহ ও একমুখী হামলার মতো কাজ করতে পারে।

আরও পড়ুন:

এই অভিযান ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে সারোনিকের দ্রুত প্রসারের বিষয়টিও সামনে এনেছে। ওয়ার্কবোট সাময়িকীর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের এপ্রিলে লুইজিয়ানার গালফ ক্র্যাফটকে অধিগ্রহণের মাধ্যমে নিজেদের জাহাজ নির্মাণের সক্ষমতা বাড়ায় তারা। এর আট মাস পর ওই শিপইয়ার্ড সম্প্রসারণে ৩০ কোটি ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দেয় প্রতিষ্ঠানটি, যার ফলে তাদের উৎপাদন এলাকা আরও ৩ লাখ বর্গফুট বৃদ্ধি পায়।

পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর কোরসায়ার উৎপাদনের জন্য সারোনিককে ৩৯ কোটি ২০ লাখ ডলারের চুক্তি দেয় মার্কিন নৌবাহিনী। এটি ছিল এই জলযান নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির প্রথম বড় চুক্তি। মার্কিন নৌবাহিনীর মন্ত্রী জন ফেলান জানান, ১২ মাসেরও কম সময়ের মধ্যে প্রোটোটাইপ থেকে উৎপাদনে যাওয়ার এই প্রক্রিয়াটি প্রচলিত নৌ-অধিগ্রহণ কর্মসূচির চেয়ে অনেক দ্রুত ছিল।

সারোনিক এরপর ১৭৫ কোটি ডলারের তহবিল সংগ্রহ করেছে, যার ফলে প্রতিষ্ঠানটির বাজারমূল্য ৯২৫ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। বন্দর আব্বাসে কোরসায়ারের ব্যবহার প্রমাণ করে যে এই বিপুল বিনিয়োগ এখন সরাসরি যুদ্ধের সক্ষমতায় রূপান্তরিত হয়েছে।

প্রচলিত যুদ্ধজাহাজ তৈরি করতে যেখানে কোটি কোটি বা শতকোটি ডলার খরচ হয়, সেখানে এই স্বয়ংক্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলো অনেক কম খরচে এবং বিপুল সংখ্যায় উৎপাদন করা সম্ভব। এ ছাড়া কর্মীদের জীবনের ঝুঁকি না বাড়িয়ে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশেও এগুলো কাজ করতে পারে। ফলে কমান্ডারদের পক্ষে বড় ধরনের ঝুঁকি নেয়া সহজ হয়।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধেই সি-ড্রোন প্রথম বড় ধরনের যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়। ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখলের পর ইউক্রেনের নৌবাহিনীর বাকি অংশও রাশিয়ার হামলায় মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন কৃষ্ণসাগরে রুশ নিয়ন্ত্রণ মোকাবিলায় কম খরচের এসব সি-ড্রোন ব্যবহার শুরু করে ইউক্রেন। অন্যদিকে ইরান ও ইয়েমেনের হুতিরাও সরু জলপথগুলোতে নৌচলাচল ব্যাহত করতে একমুখী নৌ-ড্রোন ব্যবহার করে আসছে।

আরও পড়ুন:

মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, এক মাস আগে ওমান উপকূলে বিধ্বস্ত মার্কিন সেনাবাহিনীর একটি হেলিকপ্টার থেকে দুজন ক্রুকে উদ্ধার করতেও কোরসায়ার ব্যবহার করা হয়েছিল। এটিই ছিল মার্কিন সামরিক বাহিনীর কোনো উদ্ধার অভিযানে সি-ড্রোনের প্রথম ব্যবহার। ২০২১ সালে চালকবিহীন ব্যবস্থার জন্য গঠিত মার্কিন নৌবাহিনীর প্রথম ইউনিট ‘টাস্কফোর্স ৫৯’ জলযানটি পরিচালনা করে।

বিশেষজ্ঞরা বিবিসিকে জানিয়েছেন, কোরসায়ারের সমতল ডেকটি হেলিকপ্টারের ক্রুদের পরিবহনের কাজে ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে, যা বড় জাহাজ বা উড়োজাহাজের চেয়ে অনেক কম দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বন্দর আব্বাসে কোরসায়ারের সর্বশেষ এই ব্যবহার যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-কৌশলে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে ভবিষ্যতে মানবচালিত যুদ্ধজাহাজের পাশাপাশি স্বয়ংক্রিয় জলযানগুলোও বড় ভূমিকা রাখবে।

এএম