সামরিক বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তারা রয়টার্সকে জানান, এই হামলা কার্যকরভাবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য অতিরিক্ত সামরিক বিকল্পগুলোকে শক্তিশালী করছে। গত সপ্তাহে কংগ্রেসকে ইরানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে সংঘাত ফের শুরুর কথা জানানোর পর থেকে ট্রাম্প তার পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে বিশ্বকে ধোঁয়াশায় রেখেছেন।
লড়াই বন্ধ ও শান্তি চুক্তির পথ তৈরির জন্য করা একটি সমঝোতা স্মারক ভেঙে যাওয়ার পর পঞ্চম মাসে গড়িয়েছে ইরান যুদ্ধ। এই সংঘাত এখনো তীব্র রয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের অভিযান শুরুর পর থেকে ইরানের সামরিক বাহিনী কঠিন আঘাত পেলেও তেহরান তার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা ধরে রেখেছে। এমনকি চলাচলকারী তেলবাহী ট্যাংকার ও উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোতেও হামলা চালিয়েছে দেশটি।
মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তাদের সাম্প্রতিক বোমা হামলাগুলো ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, উপকূলীয় রাডার, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন স্থাপনা এবং ছোট নৌকা ও অন্যান্য সামুদ্রিক সম্পদকে লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের একজন বলেন, ‘এই হামলাগুলোকে ‘‘পরিস্থিতি তৈরির অভিযান’’ হিসেবে দেখা যেতে পারে। ভবিষ্যতে মার্কিন সামরিক বাহিনীকে আরও তীব্র অভিযান চালানোর নির্দেশ দেয়া হলে, এসব হামলা ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেবে।’
ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রয়োজন হলে, এটি (পরবর্তী অভিযানের) মঞ্চ প্রস্তুত করতে সাহায্য করছে।’ তবে এ সম্পর্কে পেন্টাগন তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
আরও পড়ুন:
সামরিক বিকল্প
হরমুজ প্রণালিকে আরও ভালোভাবে সুরক্ষিত রাখতে ইরানের উপকূলে মার্কিন সেনা মোতায়েনের বিকল্প তৈরিতে পেন্টাগনের পরিকল্পনার কথা জানা গিয়েছিল। তখন মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের খার্গ দ্বীপে স্থল বাহিনী পাঠানোর বিষয়েও আলোচনা করেছে। ইরানের ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানির কেন্দ্র এই দ্বীপ। তবে এ ধরনের অভিযান ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কারণ ইরান মূল ভূখণ্ড থেকে দ্বীপটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে ব্যাপক হামলা চালাতে পারে।
চলতি সপ্তাহের মঙ্গলবার ট্রাম্প জানান, খার্গ দ্বীপের বিরুদ্ধে আগের হামলাগুলোর সময় ইরানের তেল স্থাপনায় আঘাত এড়িয়ে যাওয়ার নির্দেশ তিনি নিজের সামরিক বাহিনীকে দিয়েছিলেন। তবে তিনি দ্বীপটি দখলের বিকল্পটিও খোলা রেখেছেন। ফক্স নিউজকে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা যদি তাদের যথেষ্ট দুর্বল করে দিতে পারি এবং তাদের অনেক পিছিয়ে দিই, তবে আমি এটি করবো।’
ট্রাম্প ইরানের পরমাণু কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ নামে পরিচিত একটি স্থাপনায় হামলার হুমকিও দিয়েছেন। তেহরানের প্রধান পরমাণু কেন্দ্রগুলোর একটির কাছে ভূগর্ভস্থ এই স্থাপনাটি অত্যন্ত সুরক্ষিত। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন মেরিন কর্মকর্তা মার্ক ক্যানসিয়ান বলেন, ‘খার্গ দ্বীপ দখলের মতো সামরিক বিকল্প প্রকাশ্যে আলোচনা করার ট্রাম্পের প্রবণতা দ্বিমুখী তরবারির মতো।’
তিনি বলেন, ‘এটি ইরানিদের চাপে ফেলে কূটনৈতিকভাবে সাহায্য করতে পারে। তবে এটি সামরিক বাহিনীর জন্য খারাপ। কারণ আমরা কোথায় যাচ্ছি, তা আগেই বলে দিচ্ছি।’
আরও পড়ুন:
কৌশলগত জয়, কূটনৈতিক অচলাবস্থা
মার্কিন কংগ্রেসের ভেতরের অংশসহ ইরান যুদ্ধের বিরুদ্ধে থাকা সমালোচকেরা বলছেন, এই যুদ্ধ ইরানের বড় অংশের প্রচলিত সামরিক বাহিনী ও প্রতিরক্ষা শিল্প ধ্বংস করার মতো কৌশলগত বিজয় অর্জন করেছে। তবে তেহরানের কাছ থেকে কোনো ছাড় আদায়ে এটি কূটনৈতিকভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
এই যুদ্ধ ইরানকে হরমুজ প্রণালির ওপর নজিরবিহীন প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দিয়েছে। বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ অপরিশোধিত তেলের সরবরাহের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। এমনকি ইরানের প্রচলিত নৌবাহিনী প্রায় ধ্বংস হয়ে গেলেও ড্রোন ও রকেটের মতো সক্ষমতা ব্যবহার করে দেশটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়ে যেতে পারে।
মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, এর ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে সামনে এগোনোর সেরা উপায় নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। মার্কিন আরও চতুর্থ এক কর্মকর্তা জানান, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান বাড়ানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
আটলান্টিক কাউন্সিলের সঙ্গে যুক্ত পেন্টাগনের সাবেক কর্মকর্তা ইমরান বায়ুমি বলেন, ‘ইরান নিয়ে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ট্রাম্পের ঢালাও মন্তব্যগুলো আলোচনার টেবিলে ইরানকে চাপে ফেলা এবং সামরিক বাহিনীর পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে তেহরানকে অনিশ্চয়তায় রাখার কৌশল বলে মনে হচ্ছে।’
বায়ুমি বলেন, ‘আমি হইচইকে বাস্তব পদক্ষেপ থেকে আলাদা করে দেখবো। আমার ধারণা, ট্রাম্প এবং তার জাতীয় নিরাপত্তা দলের মধ্যে যে আলোচনা হচ্ছে, তা তার অনলাইন পোস্টের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন।’



-320x167.webp)

