চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বের দুটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি চ্যানেলে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। রুবিওর এই মন্তব্যের একদিন আগে ইয়েমেনের ইরানপন্থী হুতি বিদ্রোহীদের হুমকির মুখে সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেলবাহী তিনটি ট্যাংকার লোহিত সাগর থেকে এশিয়ার উদ্দেশে যাত্রা বাতিল করে ফিরে যায়।
লোহিত সাগরের প্রবেশমুখের নিয়ন্ত্রণে থাকা হুতিরা সোমবার সৌদি আরবের ওপর নৌ অবরোধ ঘোষণা করে। এতে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া যুদ্ধ নতুন মাত্রা পেয়েছে। এই যুদ্ধে উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। ইরান আগে থেকেই হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে হুমকি দিয়ে আসছে। এমন পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের দৈনিক লাখ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানির প্রধান বিকল্প পথ হয়ে দাঁড়িয়েছে লোহিত সাগর।
রুবিও বলেন, ‘ওয়াশিংটন সব সময় কূটনীতির প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ। কিন্তু বর্তমান সমস্যা হলো, তারা (তেহরান) আলোচনার বিষয়ে আন্তরিক নয়। তারা আন্তরিক হলে আমরাও আন্তরিক হব। তা না হলে আমাদের ও মিত্রদের স্বার্থ রক্ষায় যা প্রয়োজন, আমরা তা করব।’
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইরানকে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিতে দেয়া যাবে না। এটি হলে বিশ্বের জন্য বিপজ্জনক নজির তৈরি হবে। বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জন্য, যাদের অনেকের দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের সঙ্গে ভূখণ্ডগত বিরোধ রয়েছে। রুবিও বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে যদি এমন কোনো নজির তৈরি হয় যে, একটি রাষ্ট্র সিদ্ধান্ত নেবে তারা আন্তর্জাতিক জলপথ নিয়ন্ত্রণ করবে, টোল আদায় করবে, আর টোল না দিলে জাহাজ উড়িয়ে দেবে, তাহলে এটি একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত হবে। বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে, এমনকি এই অঞ্চলেও এর পুনরাবৃত্তি হবে।’
কূটনীতির চেষ্টা অব্যাহত
কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টাও অব্যাহত রয়েছে। ইরানের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সোমবার রয়টার্সকে জানান, জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সই করা অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি চুক্তি টিকিয়ে রাখতে মধ্যস্থতাকারীদের কাছ থেকে ১০ দিনের একটি নতুন যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পেয়েছে তেহরান। এদিকে ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এস্কান্দার মোমেনি মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান সফর করেছেন এবং ইসলামাবাদকে তাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার অনুরোধ জানিয়েছেন।
ইরানে টানা মার্কিন হামলা
কূটনৈতিক অগ্রগতির কোনো লক্ষণ দেখা না গেলেও মঙ্গলবার টানা ১১তম রাতের মতো ইরানের বিভিন্ন স্থানে বোমা হামলা চালিয়েছে মার্কিন সেনাবাহিনী। ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ফার্স জানিয়েছে, বুধবার ভোরে তেহরানের বাসিন্দারা বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পান। এ সময় রাজধানীর আকাশে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়। ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থা ইরনাকে এক কর্মকর্তা জানান, বুধবার ভোরে দেশটির একমাত্র পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র অবস্থিত বুশেহর প্রদেশের তিনটি স্থানে মার্কিন হামলা হয়েছে। এর মধ্যে ওই কেন্দ্রের কাছাকাছি একটি বৈদ্যুতিক পোস্টও রয়েছে।
ইরানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, বুধবার ভোরে তারা কুয়েত, জর্ডান ও বাহরাইনে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় ড্রোন হামলা চালিয়েছে। সেনাবাহিনীর ভাষ্য, তারা জর্ডানের আল আজরাক বিমানঘাঁটির আবাসিক ভবন ও সরঞ্জাম মজুতাগারে আঘাত হেনেছে। পরে বাহরাইনের শেখ ঈসা বিমানঘাঁটির সরঞ্জাম গুদাম ও উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণের হ্যাঙ্গারে আরাশ আত্মঘাতী ড্রোন দিয়ে হামলা চালানো হয়। তবে এই হামলার বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিশ্চিত করেছেন, এখন পর্যন্ত এই যুদ্ধে ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে গত কয়েক দিনে জর্ডান ও ইরাকে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের হামলায় চারজন নিহত হন। হুতিদের হুমকির পর মঙ্গলবার তেলের দাম ২ শতাংশের বেশি বেড়েছিল। বুধবার এশিয়ার বাজারে দাম আরও বেড়েছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯১ ডলারের ওপরে উঠেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিনের দাম আবার গ্যালনপ্রতি ৪ ডলার ছাড়িয়েছে।
অশ্রুর দ্বার
জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেয়া এক চিঠিতে মঙ্গলবার হুতিরা হুঁশিয়ারি দেয়, সৌদি তেল বহন বা খালাস করা যেকোনো জাহাজে তারা হামলা চালাবে। ট্রাম্প বলেছেন, হুতিরা এখনো লোহিত সাগরের প্রবেশমুখ বাব-এল-মান্দেব বা ‘অশ্রুর দ্বার’ প্রণালি বন্ধ করেনি। বন্ধ করলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার হুমকি দিয়েছেন তিনি। ট্রাম্প বলেন, ‘এখন পর্যন্ত তা হয়নি। এমন কিছু ঘটলে আমরা সেটা সামলে নেব।’
সৌদি আরব যুদ্ধ চলাকালে পাইপলাইনে ইয়ানবু বন্দরে তেল সরবরাহ করে জাহাজ চলাচলের বিঘ্ন এড়িয়ে চলছিল। তবে হুতিরা যদি এই বিকল্প পথ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়, তাহলে সৌদি আরবের বেশির ভাগ তেল রপ্তানি আটকে যাবে এবং বৈশ্বিক তেল সরবরাহ কমে যাবে। মঙ্গলবার ট্রাম্প আবারও নাতাঞ্জের পারমাণবিক স্থাপনায় ‘শিগগিরই’ হামলার হুমকি দিয়েছেন। ২০২৫ সালের জুনে পাহাড়ি অঞ্চলে অবস্থিত এই স্থাপনায় হামলার পর তিনি বলেছিলেন, এটি ‘পুরোপুরি ধ্বংস’ করে দেয়া হয়েছে। ইরান পাল্টা প্রতিশোধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক মার্কিন হামলায় ৫০ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত ও ৫০০ জন আহত হয়েছেন।





