হরমুজে অচলাবস্থা: যুদ্ধ, সমঝোতা নাকি টিকে থাকার লড়াই—কোন পথে ইরান

বিবিসির বিশ্লেষণ

প্রয়াত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ম্যুরাল
প্রয়াত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ম্যুরাল | ছবি: বিবিসি
0

গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ১০ দিনের পাল্টাপাল্টি হামলার পর ইরানের নেতৃত্বের সামনে আপাতদৃষ্টিতে তিনটি পথ খোলা রয়েছে। তবে বিজয়ের স্পষ্ট পথ কোনোটিই দেখাচ্ছে না।

প্রথম পথটি হচ্ছে ওয়াশিংটনের বেশির ভাগ চাহিদা মেনে নেয়া। এর অর্থ হলো, বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বন্ধ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে অবাধ ও নিরাপদ চলাচলের নিশ্চয়তা দেয়া, উচ্চ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ছেড়ে দেয়া বা লঘু করা এবং বৈশ্বিক পারমাণবিক পর্যবেক্ষণ সংস্থার নাক গলানো পরিদর্শন মেনে নেয়া। বিনিময়ে তেহরান ইরানি বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ এবং আরও হামলা থেকে সুরক্ষা চাইবে। এই পথটি সম্ভবত সবচেয়ে কম ব্যয়বহুল, তবে রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে ক্ষতিকর।

হরমুজ প্রণালিতে ইরানের স্বীকৃত ভূমিকা নিশ্চিত না করে জলপথটি খুলে দেয়ার অর্থ হবে সদ্য আবিষ্কৃত এক প্রতিরোধ সক্ষমতা বিসর্জন দেয়া। তেহরানের অনেকে মনে করেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র, আঞ্চলিক প্রক্সি এমনকি পারমাণবিক কর্মসূচির চেয়েও এই সক্ষমতা এখন কার্যকর। ইরান প্রথমবারের মতো দেখিয়েছে, শত্রুরা তার ভূখণ্ডে হামলা চালালে সে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তাৎক্ষণিক ক্ষতি চাপিয়ে দিতে পারে।

অন্যদিকে পারমাণবিক কর্মসূচিকে দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের এমন এক অধিকার হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা ছেড়ে দিতে বাধ্য করা যাবে না। কয়েক মাসের হামলার পর পারমাণবিক কার্যক্রমের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞার দাবি মেনে নিলে কট্টরপন্থীরা প্রচার করতে পারবেন যে, মার্কিন সামরিক চাপই কাজে দিয়েছে। এতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইরাকের শিয়া গোষ্ঠী ও ইয়েমেনের হুতিদের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে দাবির দরজা খুলে যেতে পারে।

দ্বিতীয় পথটি হলো উত্তেজনা আরও বাড়ানো। এ ক্ষেত্রে ইরান এই অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি, জাহাজ চলাচল এবং উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় হামলা জোরদার করতে পারে। এতে জ্বালানির দাম বাড়বে এবং ব্যাপক বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে বলে ইরান আশা করে। এতে ওয়াশিংটন ও তার মিত্ররা সমঝোতায় বাধ্য হবে। এতে সবচেয়ে বেশি সামরিক ঝুঁকি রয়েছে। উপসাগরীয় অবকাঠামোয় ব্যাপক প্রাণহানি বা মারাত্মক ক্ষতির কোনো হামলা প্রতিবেশীদের সরাসরি সংঘাতে টেনে আনতে পারে এবং ইরানকে বৃহত্তর জোটের মুখোমুখি হতে হতে পারে।

তৃতীয় পথটি হলো বর্তমান অস্থিতিশীলতা বজায় রাখা। অর্থাৎ, জাহাজ চলাচল ও জ্বালানির বাজারে দর কষাকষির জোর ধরে রাখার মতো যথেষ্ট চাপ প্রয়োগ করা, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু করার মতো নয়। এটি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের চিরচেনা চিন্তাধারার সঙ্গে মিলে যায়। শক্তিশালী শত্রুকে হারানোর দরকার নেই, শত্রু যতদিন লড়তে চায়, তার চেয়ে বেশি টিকে থাকতে পারলেই চলবে। টিকে থাকাকেই বিজয় হিসেবে তুলে ধরা যেতে পারে। তবে নিষেধাজ্ঞা, যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি ও মূল্যস্ফীতি দেশের ভেতরে চাপ বাড়িয়ে চলেছে।

সময় যত গড়াবে, একটি বৈপরীত্য দেখা দিতে পারে। ইরান হরমুজ প্রণালিকে যত বেশি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে, তা তত কম শক্তিশালী হয়ে পড়বে। কারণ, বিভিন্ন দেশ এই অঞ্চল থেকে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্য রপ্তানির নতুন পথ খুঁজে নেবে। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ এই বৈপরীত্য স্বীকার করে বলেছেন, হরমুজের মূল্য এর ওপর দিয়ে জাহাজ চলাচল কমানোর মধ্যে নয়, বরং বাড়ানোর মধ্যেই নিহিত। স্থায়ীভাবে অনিরাপদ এই জলপথ বিশ্বকে ইরানকে এড়িয়ে চলার পথ খুঁজতে উৎসাহিত করবে।

সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন কারা
বিষয়টিকে আরও জটিল করেছে ইরানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার অস্পষ্টতা। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরুর সময় ফেব্রুয়ারিতে এক হামলায় নিহত হন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তার সময়ে নির্বাচিত রাজনীতিবিদ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর মধ্যে বিরোধ সর্বোচ্চ নেতার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে মেটানো হতো। কয়েক মাসের যুদ্ধ এবং খামেনির ছেলে মুজতবার নতুন নেতৃত্বে ক্ষমতার সেই ভারসাম্য এখন কিছুটা অস্পষ্ট।

প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও তার কূটনীতিকেরা অর্থনৈতিক চাপ কমাতে ও স্থিতিশীলতা ফেরাতে সমঝোতার পক্ষে থাকতে পারেন। অন্যদিকে সংসদের কট্টরপন্থী সদস্য, শক্তিশালী অনির্বাচিত প্রতিষ্ঠান এবং রক্ষণশীল গণমাধ্যম আশঙ্কা করছে, বড় ধরনের ছাড় ইসলামি প্রজাতন্ত্রের আদর্শিক ভিত্তিকে দুর্বল করবে এবং মূল সমর্থকদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সশস্ত্র বাহিনী, বিশেষ করে বিপ্লবী গার্ডকে নিয়ে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, আঞ্চলিক জোট এবং হরমুজ প্রণালির কৌশল বিপ্লবী গার্ডের প্রভাবের কেন্দ্রে রয়েছে। তবে উত্তেজনা বাড়ানো ও আলোচনার সিদ্ধান্তে কমান্ডাররা কতটা প্রভাব রাখেন, তা এখনো অস্পষ্ট।

এই তিনটি পথ ব্যবস্থাটির বিভিন্ন অংশে সমানভাবে খরচ চাপায় না। বাস্তববাদীরা চুক্তির পক্ষে থাকতে পারেন, কট্টরপন্থীরা দীর্ঘকাল টিকে থাকার পক্ষে যেতে পারেন এবং কিছু সামরিক কমান্ডার উত্তেজনা বৃদ্ধিকে ইরানের দর কষাকষির শক্তি বৃদ্ধির উপায় হিসেবে দেখতে পারেন। ফলে প্রশ্নটি শুধু ইরান কোন পথ বেছে নেবে, তা নয়; বরং সেই সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা কার হাতে আছে, সেটিও।

ইরানিরা কী বলছেন
নেতৃত্বের ‘টিকে থাকার’ ধারণা সাধারণ মানুষের কাছে ভিন্নরকম দেখায়। সামরিক অভিযান বন্ধ ও হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করতে এবং পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে যুদ্ধ শেষ করার চুক্তিতে পৌঁছাতে জুনে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করে। তবে সই হওয়ার তিন সপ্তাহ পরই হরমুজে জাহাজে ইরানের হামলা ও যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা হামলার জেরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি ‘শেষ’ ঘোষণা করেন।

ইরানের এক নারী বিবিসি ফার্সিকে বলেন, লড়াই আবার শুরু হওয়ায় তিনি ‘অত্যন্ত মর্মাহত’ হয়েছেন। তিনি আশা করেছিলেন, সমঝোতা স্মারক দুই পক্ষকে অবশিষ্ট বিরোধ মেটাতে ও স্থিতিশীলতা ফেরাতে সময় দেবে। কিন্তু এর পরিবর্তে তিনি এখন অবকাঠামো ধ্বংস এবং বেসামরিক ও সামরিক ব্যক্তিদের মৃত্যুর আশঙ্কা করছেন। তিনি ইরানের অভ্যন্তরের কট্টরপন্থীদের ধ্বংসাত্মক নীতির জন্য দায়ী করেছেন এবং একই সঙ্গে বিদেশে থাকা বিরোধী নেতাদের নিন্দা করেছেন, যারা তার মতে যুদ্ধকে উৎসাহিত করেছেন।

তেহরানের আরেক নারী বলেন, তিনি যে বৈদেশিক বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন, সেটি বন্ধ হয়ে গেছে। ডক্টরেট ডিগ্রি এবং ১৭ বছরের অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও চার মাস ধরে তিনি বেকার। তিনি বলেন, ‘কেউ নিয়োগ দিচ্ছে না, কারণ কী হবে তা কেউ জানে না।’ তিনি আকাশছোঁয়া দাম, বিদ্যুৎ ও পানির অভাব, চুরি বৃদ্ধি এবং মাঝেমধ্যে রাতে গুলির শব্দের কথা বর্ণনা করেন। এখন তিনি শহরে চলাফেরা সীমিত করে দিয়েছেন।

এই ঘটনাগুলো কোনো একক রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের দিকে ইঙ্গিত করে না। বিদেশি হামলা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরোধীদের মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ তৈরি করতে পারে। তবে প্রতিরোধের নামে জনগণকে অনির্দিষ্টকাল কষ্ট সহ্য করতে বলার সীমাবদ্ধতাও এতে ফুটে ওঠে।

ট্রাম্পকেও কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে: যুদ্ধ বিস্তৃত করা, সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ বজায় রাখা, নাকি কঠোর তত্ত্বাবধানে ইরানকে সীমিত পরিসরে বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচির অনুমতি দিয়ে একটি সমঝোতা মেনে নেয়া। এখানেও বিজয়ের কোনো স্পষ্ট পথ নেই। হামলা, মধ্যস্থতা ও অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির চক্র চলতে থাকলে সংঘাত আরও কয়েক মাস চলতে পারে। এখন মূল প্রশ্ন হলো, পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ, নতুন করে অস্থিরতা বা বিকল্প পথ তৈরির আগ পর্যন্ত ইরানের নেতারা কতদিন হরমুজকে দর কষাকষির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেন।

এএম