স্থাপনাটির নাম কুহ-এ-কোলাং গাজ লা বা ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’। এটি ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রের দক্ষিণ পাশে অবস্থিত। ২০২৫ সালে ইরান-ইসরাইলের ১২ দিনের যুদ্ধের সময় ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’ চালিয়ে নাতাঞ্জে বোমা হামলা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। তবে পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন এখনো অক্ষত রয়ে গেছে। ইরান সেখানে খননকাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে ঠিক কী রাখা হয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। জাতিসংঘের পারমাণবিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা এই স্থাপনায় কখনোই প্রবেশাধিকার পায়নি। তবে মঙ্গলবার ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প স্বীকার করেছেন, ইরান হয়তো সেখানে সেন্ট্রিফিউজ সরিয়ে নিয়ে থাকতে পারে। সম্ভবত এমন গভীরতায় সেগুলো রাখা হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডারের সবচেয়ে শক্তিশালী বোমার জন্যও চ্যালেঞ্জ হতে পারে। ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা ওই এলাকায় সম্ভবত খুব শিগগিরই আঘাত হানব। এতে তাদের কিছুই করার নেই।’
আগের হামলার পরই তৈরি এই ঘাঁটি
তেহরান থেকে প্রায় ২২৫ কিলোমিটার (১৪০ মাইল) দক্ষিণে নাতাঞ্জের পাশেই পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে নতুন এই প্রকল্প নির্মাণ করা হচ্ছে। মাটির ওপরে ও নিচে থাকা নাতাঞ্জ স্থাপনা দুই দশক আগে প্রথম প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই আন্তর্জাতিক উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে। ইসরাইলের সম্ভাব্য চালানো একটি হামলাসহ নাতাঞ্জে বারবার নাশকতামূলক হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলায় সেন্ট্রিফিউজ তৈরির একটি কেন্দ্রও ধ্বংস হয়। এরপরই ইরান পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে কাজ শুরু করে।
দেশটির শুষ্ক মধ্যাঞ্চলীয় মালভূমিতে ২ দশমিক ৭ বর্গকিলোমিটার (১ বর্গমাইল) এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই স্থাপনাটি বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, বেড়া এবং ইরানের আধা সামরিক বাহিনী বিপ্লবী গার্ড দ্বারা সুরক্ষিত। স্যাটেলাইট চিত্রে এর একাধিক প্রবেশপথ দেখা যায়।
২০২৩ সালে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের এক প্রতিবেদনে জেমস মার্টিন সেন্টার ফর ননপ্রলিফারেশন স্টাডিজের বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, ইরান সম্ভবত ৮০ মিটার (২৬০ ফুট) থেকে ১০০ মিটার (৩২৮ ফুট) গভীরে একটি স্থাপনা তৈরি করছে। এরপরও খননকাজ চলতে থাকায় কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, এটি ভূগর্ভে আরও গভীরে হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই নির্মাণ প্রকল্পের বিশাল আকার ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ইরান এই ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি সেন্ট্রিফিউজও তৈরি করতে পারবে। সেন্ট্রিফিউজ হলো নলাকার যন্ত্র, যা কয়েক ডজন যন্ত্রের বড় ক্যাসকেড আকারে সাজানো থাকে এবং দ্রুত ইউরেনিয়াম গ্যাস ঘুরিয়ে সেটিকে সমৃদ্ধ করে। পাহাড়ের সুরক্ষায় অতিরিক্ত ক্যাসকেড ঘুরিয়ে ইরান দ্রুত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে পারবে।
এ ধরনের ভূগর্ভস্থ স্থাপনার কারণেই যুক্তরাষ্ট্র জিবিইউ-৫৭ বোমা তৈরি করেছে, যা বিস্ফোরিত হওয়ার আগে অন্তত ৬০ মিটার (২০০ ফুট) মাটি ভেদ করতে পারে বলে দাবি মার্কিন সেনাবাহিনীর। জানা গেছে, স্থাপনা ধ্বংস নিশ্চিত করতে পরপর দুটি বোমা ব্যবহারের বিষয়ে মার্কিন কর্মকর্তারা আলোচনা করেছেন। তবে পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের মতো গভীরে থাকা কোনো স্থাপনায় এই ধরনের হামলা কার্যকর হবে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে বোমা হামলার হুমকি
মঙ্গলবার লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনের সঙ্গে বক্তব্য দেয়ার সময় ট্রাম্প প্রথমে ইরানের উচ্চ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুতের প্রসঙ্গ তুলে পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনকে হালকাভাবে দেখানোর চেষ্টা করেন। ২০২৫ সালের হামলার আগে ইরান অস্ত্র তৈরির মানের কাছাকাছি ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করেছিল। এরপর থেকে ইরান আবার সমৃদ্ধকরণ শুরু করেছে বলে জানা যায়নি এবং এর মজুত এখনো বোমা হামলার শিকার সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রেই আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে ট্রাম্প বলেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যে পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন মার্কিন বোমারু বিমানের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু। প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, ‘সাধারণত আমি এটা বলতাম না। তারা এ ব্যাপারে কিছু করতে পারবে বলে মনে করলে আমি কখনো বলতাম না। তবে আমরা খুব শিগগিরই ওই এলাকায় প্রচণ্ড আঘাত হানব।’
ইরান বলছে, যুদ্ধ চলাকালে দেশটির একমাত্র পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বুশেহরের আশপাশের এলাকা ইতিমধ্যে হামলার শিকার হয়েছে। তবে রাশিয়ার পরিচালিত এই চুল্লির কোনো ক্ষতি হয়নি। তেহরান আরও জানিয়েছে, দারখোভিন পারমাণবিক কেন্দ্র নির্মাণের জন্য বরাদ্দ পরিষ্কার করা এলাকাটিতে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালিয়েছে। তবে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) বলেছে, তারা সবশেষ যখন ওই স্থাপনা পরিদর্শন করেছিল, তখন সেখানে কোনো পারমাণবিক সামগ্রী ছিল না।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের একমাত্র পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বারাকাহতে যুদ্ধের সময় হামলা হয়েছে। ইরান পরে দারখোভিন হামলার জবাবে অনির্দিষ্ট ‘প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ’ নেয়ার হুমকি দিয়েছে।
দশকজুড়ে পশ্চিমাদের উদ্বেগে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি
২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ফোরদো, ইসফাহান ও নাতাঞ্জ পারমাণবিক কেন্দ্রে বোমা হামলা চালায়। এই তিনটি কেন্দ্রেই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার কাজ চলছিল।
২০২৫ সালের যুদ্ধ ও সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধের সময় ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই বলেছে, ইরান যেন কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করাই তাদের লক্ষ্য। ইরান দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, তাদের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ। ২০০৩ সাল থেকে ইরানের কোনো সক্রিয় সামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি নেই বলে আইএইএ ও পশ্চিমাদের ধারণা। মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে ইসরাইলকেই মনে করা হয়।
তবে সাম্প্রতিক যুদ্ধের আগেও ইরানি কর্মকর্তারা পারমাণবিক বোমা তৈরির হুমকি বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। যুদ্ধের প্রথম মুহূর্তে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি নিহত ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এর আগে একটি মৌখিক ফতোয়া বা ধর্মীয় আদেশ জারি করেছিলেন, যেখানে বলা হয়েছিল পারমাণবিক অস্ত্র ইসলাম বিরোধী। তবে তার ছেলে ও ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনি পারমাণবিক বোমার বিষয়ে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি এখনো প্রকাশ করেননি।
ব্যবহারযোগ্য একটি অস্ত্র তৈরি করতে হলে ইরানকে প্রথমে ৯০ শতাংশ বিশুদ্ধতা পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে হবে। এরপর একটি প্রকৃত বোমা তৈরি করতে হবে। সম্ভবত এটিকে ক্ষুদ্র আকারে বানিয়ে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রে যুক্ত করার প্রয়োজন হবে। এই প্রক্রিয়ায় কয়েক মাস বা বছর সময় লাগবে। এই সময়ের মধ্যে ইসরাইলি বা মার্কিন গোয়েন্দাদের নজরে পড়ার ঝুঁকিও থাকবে।





