ধারণা করা হচ্ছে, সৌদি আরবের সঙ্গে এই চুক্তি অনুমোদনের জন্য কংগ্রেসকে অনুরোধ জানানোর ঘোষণা দেবেন ট্রাম্প। ঘোষণার সময় নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কারণ, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধের একটি অন্যতম কারণ হলো তেহরানকে অভ্যন্তরীণভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করা থেকে বিরত রাখা এবং দেশটির পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সম্ভাবনা প্রায় অসম্ভব করে তোলা।
জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি এই চুক্তি ৩০ বছর মেয়াদি হবে এবং এতে ওয়েস্টিংহাউসের মতো মার্কিন প্রতিষ্ঠান কর্মসূচি বাস্তবায়নে যুক্ত থাকবে। যৌথ এক গবেষণার পর সৌদি আরবে একটি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র নির্মাণের সুযোগ থাকতে পারে এই চুক্তিতে। বছরের পর বছর ধরে এই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছিল। এক পর্যায়ে বাইডেন প্রশাসন চেয়েছিল, ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার শর্তে সৌদি আরবকে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ দেয়া হোক। তবে সৌদি আরব এখনো এতে রাজি হয়নি।
পর্যালোচনার জন্য এই পরিকল্পনা কংগ্রেসে পাঠানো হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সেখানে আইনপ্রণেতাদের বিরোধিতার মুখে পড়তে পারে এটি। কারণ, সৌদি আরবের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে নজরদারির সুরক্ষা ব্যবস্থার ঘাটতি নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন।
সৌদি আরব অতীতে বলেছে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র পেলে তাদেরও তা প্রয়োজন হবে। তবে ইরান বারবার এমন কোনো উদ্দেশ্য অস্বীকার করে আসছে। তবে একাধিক প্রশাসনের সময়ে দীর্ঘ আলোচনা চলাকালে যুক্তরাষ্ট্র আশঙ্কা করেছিল, রিয়াদ যা চায় তা যুক্তরাষ্ট্র সরবরাহ না করলে তারা পারমাণবিক প্রযুক্তির জন্য অন্য কোথাও চেষ্টা চালাবে। ধারণা করা হচ্ছে, এই চুক্তিতে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) কঠোর নজরদারির বিধান থাকবে না। ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির অধীনে ইরান যেসব ‘অতিরিক্ত প্রটোকল’ মানতে বাধ্য ছিল, এই চুক্তিতে তা যুক্ত হচ্ছে না।
ডিফেন্স প্রায়োরিটিজের মধ্যপ্রাচ্য কর্মসূচির প্রধান রোজমেরি কেলানিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক পোস্টে সতর্ক করে বলেন, ‘সৌদি আরবকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রযুক্তি দেয়া অনেক দিক থেকেই ভয়াবহ সিদ্ধান্ত। তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুদ্ধ চলাকালে এটি করা বিশেষভাবে বোকামি।’ তিনি এই সিদ্ধান্তকে বেপরোয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী বলে অভিহিত করেন। রোজমেরির প্রশ্ন, ‘সৌদির এই সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি ইরানকে বোমা তৈরির জন্য প্রচণ্ড চাপে ফেলবে। ট্রাম্প কি ইরানকে অস্ত্র তৈরিতে উসকানি দেয়ার চেষ্টা করছেন?’
তবে অন্যরা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে সৌদি আরব এখন এমন একটি পরিণত দেশে পরিণত হয়েছে, যারা তেল থেকে জ্বালানি উৎস বৈচিত্র্যময় করতে চায়। পারমাণবিক অস্ত্র না রাখার সিদ্ধান্তটি যৌক্তিক কি না, তা নিয়ে ইরানের ভেতরেও চলছে জোরালো বিতর্ক। এখন সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরবকে অভ্যন্তরীণভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অনুমতি দেয়ায় তেহরানে ক্ষোভ তৈরি হবে। অথচ একই কারণে ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর আগে ফেব্রুয়ারিতে জেনেভায় আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে দেশের ভেতরে সমৃদ্ধকরণের অধিকার ১০ থেকে ২০ বছরের জন্য স্থগিত রাখার প্রতিশ্রুতি দিতে বলেছিল। ইরান তিন বছরের জন্য স্থগিতের বিষয়টি বিবেচনা করতে রাজি ছিল। এ ছাড়া, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে সৌদি আরব, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি আঞ্চলিক কনসোর্টিয়ামের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে আগ্রহী ছিল যুক্তরাষ্ট্র।
সৌদি আরব ভিয়েনাভিত্তিক জাতিসংঘের সংস্থা আইএইএ-র সদস্য রাষ্ট্র। এই সংস্থা শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করে এবং দেশগুলোর গোপন পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি নেই তা নিশ্চিত করতে পরিদর্শন চালায়। ‘১২৩ চুক্তি’ নামে পরিচিত পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তিগুলো পর্যালোচনা ও প্রয়োজনে আটকে দেয়ার ক্ষমতা রাখে মার্কিন কংগ্রেস। উল্লেখ্য, পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের প্রক্রিয়ায় ৯০ শতাংশ বিশুদ্ধতায় সমৃদ্ধকরণ একটি ধাপমাত্র।
কাতারে হামাসের কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে ইসরাইলের হামলা চালানোর পর সৌদি আরব ও পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ পাকিস্তান একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করে। পরে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, প্রয়োজনে সৌদি আরবের জন্য তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি ‘উন্মুক্ত করে দেয়া হবে’। এটিকে দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত ইসরাইলের জন্য হুঁশিয়ারি হিসেবে দেখা হয়।
সৌদি আরবের প্রতিবেশী সংযুক্ত আরব আমিরাত দক্ষিণ কোরিয়ার সহায়তায় বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘১২৩ চুক্তি’ সই করেছে। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাত সমৃদ্ধকরণের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করেনি। পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিরোধ বিশেষজ্ঞরা একে পারমাণবিক শক্তি চাওয়া দেশগুলোর জন্য ‘স্বর্ণমান’ হিসেবে তুলে ধরেন।
গত নভেম্বরে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ওয়াশিংটন সফরের সময় হোয়াইট হাউস দুই দেশের মধ্যে পারমাণবিক সহযোগিতার একটি কাঠামো ঘোষণা করে। এই কাঠামো ‘কয়েক দশকব্যাপী কোটি কোটি ডলারের পারমাণবিক জ্বালানি অংশীদারত্বের আইনি ভিত্তি তৈরি করে’ বলে জানানো হয়। চলতি বছর কংগ্রেসে দেয়া এক প্রতিবেদনে মার্কিন প্রশাসন এই চুক্তির প্রতি সমর্থন দিতে বলেছে। এতে বলা হয়েছে, এই চুক্তি ‘আগামী কয়েক দশকের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থকে খর্ব করার কৌশলগত প্রতিযোগিতার সুযোগ’ ঠেকাবে।





