এআইয়ের যুগে চাকরির ভবিষ্যৎ: কারা টিকবেন, কারা হারাবেন

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি | ছবি: সংগৃহীত
2

মানুষের কাজ করে দেবে যন্ত্র কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে এমন বড় বড় দাবি করছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো। কিছু কাজ পুরোপুরি যন্ত্রের হাতে চলে যাবে, আর কিছু ক্ষেত্রে মানুষের কাজকে আরও সহজ করে দেবে এআই। বিশ্বের বড় বড় প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারেরাও এখন এই প্রযুক্তির পেছনে ঢালছেন বিপুল অর্থ। এর নেপথ্যে একটি বড় হিসাব হলো জনবল কমিয়ে খরচ বাঁচানো।

কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মী সংখ্যা নিয়ে এখন করপোরেট দুনিয়ায় নতুন সুর ‘জনবল না বাড়ানোটাই এখন অগ্রগতি’। বিনিয়োগকারীরা প্রশ্ন তুলছেন, নতুন লোক নিয়োগ দেয়ার দরকার আছে কি, নাকি সেই কাজ চালিয়ে নেয়া যাবে ‘এআই এজেন্ট’ দিয়ে। এই ভার্চুয়াল কর্মীরা নির্দিষ্ট কাজের দায়িত্ব পালন করবে। এমনকি বেশ কিছু দক্ষ কাজও তারা করতে সক্ষম।

এসব দাবির অর্ধেকও যদি সত্যি হয়, তবে খাত ও পেশা নির্বিশেষে সবার জীবনে এর ছাপ পড়বে। হয়তো ধারণার চেয়েও অনেক দ্রুত এই দিন আসতে চলেছে। নোবেল পুরস্কারজয়ী অর্থনীতিবিদেরা সম্প্রতি সতর্ক করেছেন, এআই যেন জীবনযাত্রার মান বাড়ায় এবং কোটি কোটি মানুষকে বেকার করে না দেয়, তা নিশ্চিত করতে বিশ্বকে ‘এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে’। গত মাসে লন্ডনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোও অভিযোগ করেছে, এআইয়ের ধাক্কায় চাকরির বাজার বদলে যাওয়ায় তারা প্রয়োজনীয় দক্ষ কর্মী খুঁজে পাচ্ছে না। সময়টা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ের। তবে বিভিন্ন গবেষণার তথ্য-উপাত্তে ইতিমধ্যেই ফুটে উঠছে বেশ কিছু চোখে পড়ার মতো প্রবণতা।

সফটওয়্যার তৈরিতেই সবচেয়ে বড় ধাক্কা
এআই মডেলগুলো মানুষের কাজ কতটা দক্ষতার সঙ্গে করতে পারছে, তা মাপার জন্য একটি শিল্প-মানদণ্ড রয়েছে। কম্পিউটার সফটওয়্যার ব্যবহার ও তৈরির কাজে সেই মানদণ্ড বলছে, মাত্র তিন বছর আগেও বড় ভাষা মডেলগুলো (এলএলএম) মানুষের কয়েক সেকেন্ড বা মিনিটে করা কাজ নির্ভরযোগ্যভাবে করতে পারত। কিন্তু এখন সেগুলো এক ঘণ্টার মতো সময়সাপেক্ষ জটিল কাজও অনায়াসে সেরে ফেলছে।

এখন কিছু এলএলএম ক্রিপ্টোকারেন্সি চুক্তির ভুল ধরিয়ে দিতে পারছে। এমনকি নিজেই মডেলটির উন্নয়ন ও পরিমার্জনও করছে, যা করতে একজন মানুষের কয়েক ঘণ্টা লেগে যেত। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আগামী বছর নাগাদ মডেলগুলোর সর্বশেষ প্রজন্ম পুরোপুরি নিজে থেকেই নিজেদের তৈরি করা শুরু করবে। এই পরিবর্তন শুধু সফটওয়্যার কোডিংয়েই নয়, একই ধারা দেখা যাচ্ছে আর্থিক বিশ্লেষণ, প্রাথমিক পর্যায়ের আইনি কাজ, এমনকি সৃজনশীল শিল্পের কিছু এন্ট্রি-লেভেল কাজেও।

সবচেয়ে বেশি ভুগছেন তরুণেরা
চাকরির বাজারে এই বদলের প্রভাব কেমন? এ বিষয়ে সবচেয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণটি এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। চার বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে এতে দেখা হয়েছে, এআইয়ের সরাসরি ঝুঁকিতে থাকা পেশা (যেমন সফটওয়্যার ডেভেলপার ও কাস্টমার সেবা প্রতিনিধি) এবং ঝুঁকির বাইরে থাকা পেশায় (স্বাস্থ্যকর্মী, শিশু পরিচর্যাকারী ও নাপিত) বয়স অনুযায়ী কর্মসংস্থানের চিত্রটি কেমন দাঁড়িয়েছে।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মজুরি ও চাকরির তথ্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, চ্যাটজিপিটি সহজলভ্য হওয়ার পর থেকে ২২ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণদের কর্মসংস্থান কমেছে ২ দশমিক ৭ শতাংশ। অর্থ, সফটওয়্যার ও সৃজনশীল শিল্পের মতো এআইয়ের সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা খাতগুলোয় এই হার ১২ দশমিক ৮ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। যদিও এ নিয়ে সব অর্থনীতিবিদ একমত নন। তাদের অনেকের যুক্তি, সুদের হার বৃদ্ধিসহ অন্যান্য কারণেও কর্মসংস্থান কমতে পারে।

চ্যাটজিপিটিসহ অন্যান্য এলএলএম চালু হওয়ার পর অনলাইনে চাকরির বিজ্ঞাপনেও এর ছাপ পড়েছে। ওইসিডির সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বেশি ঝুঁকিতে থাকা খাতের (যেমন টেলিমার্কেটিং ও আইনি সেবা) সঙ্গে কম ঝুঁকিতে থাকা খাতের (নির্মাণ, পরিচ্ছন্নতা ও খাবার তৈরি) চাকরির বিজ্ঞাপনের সংখ্যায় বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে।

যুক্তরাজ্যের চিত্র এই মানদণ্ডে বেশ চোখে পড়ার মতো। এমন সময় দেশটিতে ঝুঁকিতে থাকা খাতগুলোয় চাকরির বিজ্ঞাপন কমেছে, যখন দেশটিতে সুদের হার স্থিতিশীল ছিল বা কমানো হচ্ছিল। এমনকি এই প্রবণতা গত বছরের ন্যাশনাল ইনস্যুরেন্স বৃদ্ধিরও আগের। আন্তর্জাতিক বেশির ভাগ মানদণ্ডে দেখা যাচ্ছে, সেবা খাতনির্ভর হওয়ায় এআইজনিত চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি আছে যুক্তরাজ্য।

যন্ত্রকর্মীর খরচও কম নয়
এআই ব্যবহার মাপা হয় ‘টোকেন’ দিয়ে। টোকেন হলো ছোট ছোট টেক্সটের অংশ, যা এআই ব্যবস্থা ভাষা বুঝতে, বিশ্লেষণ করতে ও তৈরি করতে ব্যবহার করে। গড়ে একটি টোকেন ইংরেজি একটি শব্দের প্রায় তিন-চতুর্থাংশের সমান।

চলতি ২০২৬ সালে এআইয়ের ব্যবহার বেড়েছে বিস্ময়করভাবে। টোকেন ব্যবহারের এই বৃদ্ধি ‘প্রতি টোকেনের কমতে থাকা খরচ’-কেও ছাড়িয়ে গেছে অনেকখানি। এআই ব্যবহারকারী বিশ্বের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলো ‘টোকেন লিডারবোর্ড’ চালু করেছে। এর মাধ্যমে সবচেয়ে উন্নত মডেল থেকে সর্বোচ্চ কর্মক্ষমতা আদায়ে কর্মীদের উৎসাহিত করা হচ্ছে।

গত কয়েক মাসে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন, এমনকি কোয়াড্রিলিয়ন টোকেন ব্যবহৃত হয়েছে। এসবের বড় অংশ গেছে ‘এজেন্টিক ব্যবহারে’, অর্থাৎ যেসব এজেন্ট স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করতে পারে সেখানে। তবে এতে বিল উঠেছে অবিশ্বাস্য অঙ্কের। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকেই এখন উন্নত মডেলের ব্যবহার সীমিত করে দিচ্ছে।

এই বিষয়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে, কতটা কাজ যন্ত্রের হাতে ছেড়ে দেয়া যাবে তার একটি সীমা রয়েছে। কাজের ধরন ভেদে ভার্চুয়াল কর্মীরা মানুষ কর্মীদের চেয়ে অনেক বেশি ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে। তবে একটি বিষয় লক্ষণীয়, পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানসহ অনেকেই এখন চীনের অনেক সস্তা এআই মডেলের দিকে ঝুঁকছে। এসব মডেল বাজারে সরবরাহ করা হচ্ছে বিনামূল্যে।

সব মিলিয়ে অনিশ্চয়তা এখনো অনেক। তবে এআইয়ের প্রভাবে চাকরির বাজার বদলে যাওয়ার স্পষ্ট প্রবণতা এখন আর অস্বীকার করার উপায় নেই।

—বিবিসির প্রতিবেদনে অবলম্বনে

এএম