রহস্যে ঘেরা ইরানের ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’, ধ্বংসের হুমকি ট্রাম্পের

বিবিসির বিশ্লেষণী প্রতিবেদন

স্যাটেলাইট চিত্রে ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনা ও পাশের পিকঅ্যাক্স পর্বত এলাকা
স্যাটেলাইট চিত্রে ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনা ও পাশের পিকঅ্যাক্স পর্বত এলাকা | ছবি: সংগৃহীত
0

পাহাড়ের বুক চিরে গভীরে চলে গেছে সুরক্ষিত টানেল। বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই ভেতরে কী চলছে। ইরানের এ রহস্যময় স্থাপনার নাম ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’। সম্প্রতি স্যাটেলাইট চিত্রে সেখানে নতুন করে নির্মাণকাজের আলামত ধরা পড়ার পর থেকেই স্থাপনাটি ধ্বংস করার হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যে কয়েকটি স্থাপনায় এখনো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা হয়নি, পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন তার মধ্যে একটি। যদিও এখনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তবে দাবি করা হচ্ছে যে ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের কিছু মজুত সেখানে থাকতে পারে। ভবিষ্যতে এ ইউরেনিয়াম আরও সমৃদ্ধ করে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহার করা সম্ভব।

গত ২১ জুলাই সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা খুব শিগগিরই ওই এলাকায় এবং জোরালোভাবে হামলা চালাব।’ এরপর ২৮ জুলাই তিনি বলেন, ‘পিকঅ্যাক্সে কী চলছে তা আমি হুবহু জানি। এটি বড় কোনো সমস্যা নয়। আমরা তাদের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস করেছি এবং চুক্তিতে না এলে পিকঅ্যাক্সকেও ধ্বংস করতে হবে।’

গত ২২ জুলাই ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে ‘কোনো পারমাণবিক কার্যক্রম চলছে না’। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হুমকিকে ‘আগ্রাসন, ধ্বংসযজ্ঞ ও অন্তর্ঘাতের বানানো অজুহাত’ হিসেবে অভিহিত করেন।

বিবিসি ভেরিফাই ও বিবিসি পার্সিয়ান বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে এবং স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে এই স্থাপনা এবং এতে হামলার সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে তথ্য জোগাড় করেছে।

কুহ-ই কোলাং, যার ফারসি অর্থ পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন, ইরানের সবচেয়ে বড় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র নাতাঞ্জ পারমাণবিক কমপ্লেক্সের ঠিক দক্ষিণে অবস্থিত। ২০২৫ ও ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল—উভয়েই নাতাঞ্জে হামলা চালিয়েছিল। পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের ভেতরের কাজ এবং প্রকৃত উদ্দেশ্য এখনো রহস্যে ঘেরা।

তেহরান আগে ইঙ্গিত দিয়েছিল, ২০২০ সালের জুলাইয়ে সন্দেহভাজন অন্তর্ঘাতমূলক হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত নাতাঞ্জের অ্যাডভান্সড সেন্ট্রিফিউজ সংযোজনের একটি ভবনের বিকল্প হতে পারে এটি। ইরানের পরমাণু শক্তি সংস্থার সাবেক প্রধান আলি আকবর সালেহি ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে বলেছিলেন, ‘নাতাঞ্জের কাছাকাছি পাহাড়ে একটি আরও আধুনিক, প্রশস্ত ও পূর্ণাঙ্গ স্থাপনা’ গড়ে তোলা হবে। তবে তিনি পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের নাম উল্লেখ করেননি।

সেন্ট্রিফিউজ দিয়ে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করা হয়, যা বেসামরিক চুল্লিতে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যায়। আবার প্রায় ৯০ শতাংশ বা তার বেশি পর্যায়ে সমৃদ্ধ করলে তা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতেও ব্যবহৃত হতে পারে।

স্থাপনাটির চারটি টানেল প্রবেশপথ রয়েছে—দুটি পূর্বদিকে ও দুটি পশ্চিমপ্রান্তে। ২০২৫ সালের জুনে ইসরাইল-ইরানের ১২ দিনের যুদ্ধের পর স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, ধীরে ধীরে গোটা এলাকা ঘিরে বিশাল সুরক্ষা বেড়া তৈরি হয়েছে। ২০২৬ সালের ৩০ জুন তোলা ছবিতে পশ্চিম প্রান্তের প্রবেশপথের কাছে বেশ কয়েকটি নির্মাণ যান দেখা গেছে।

মার্কিন সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটির (আইএসআইএস) বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরান স্থলপথে প্রবেশ বন্ধ করতে পূর্ব দিকের দুটি টানেল আংশিকভাবে ভরাট করেছে। আইএসআইএসের গবেষক স্পেন্সার ফারাগাসো বলেন, ‘গত এক বছরে এই স্থাপনায় বেশ ধারাবাহিক নির্মাণ কার্যক্রম আমরা দেখেছি। ইরানের কাজ মূলত টানেলের ভেতরের খনন ও শক্তিবৃদ্ধির দিকে কেন্দ্রীভূত, যাতে বিমান হামলা থেকে আরও ভালোভাবে সুরক্ষিত রাখা যায়।’

পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের অবস্থান হয়তো বিমান হামলা থেকে বাঁচাতেই বাছাই করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের অনুমান, স্থাপনার মূল অংশ মাটির প্রায় ১০০ মিটার (৩২৮ ফুট) গভীরে হতে পারে। এর অর্থ, এটি ফোরদো ও নাতাঞ্জের চেয়েও গভীরে অবস্থিত। গত বছর যুক্তরাষ্ট্র বাংকার বাস্টার বোমা দিয়ে ওই দুটি স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিল। এই ধরনের গভীর ও লুকানো স্থাপনায় হামলা চালানোর সক্ষমতা কেবল বাংকার বাস্টার বোমারই আছে বলে জানা যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের জিবিইউ-৫৭ বোমার ওজন প্রায় ১৩ হাজার কেজি। জানা গেছে, এটি বিস্ফোরণের আগে ১৮ মিটার কংক্রিট বা ৬১ মিটার মাটি ভেদ করতে পারে। তবে এই ধরনের বোমা দিয়েও পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করা কঠিন হবে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা।

দক্ষিণ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইরানবিষয়ক গবেষক আরমান মাহমুদিয়ান বলেন, ‘গভীরতা ও অজানা কাঠামোর কারণে ভূগর্ভস্থ প্রতিটি কক্ষ ধ্বংস করা অত্যন্ত কঠিন হবে।’ তবে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে টানেলের প্রবেশপথ, যোগাযোগব্যবস্থা, সংযোগ সড়ক ও অন্যান্য সহায়ক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে। এতে গভীরতম অংশ টিকে থাকলেও স্থাপনার কার্যক্রম কার্যত অচল হয়ে পড়বে। ফারাগাসো মনে করেন, এই স্থাপনা কিছুটা ঝুঁকিতে রয়েছে। ভেন্টিলেশন শ্যাফটকে লক্ষ্যবস্তু করলে বোমা আরও গভীরে পৌঁছাতে পারবে এবং বাংকার বাস্টার দিয়ে টানেলের প্রবেশপথ ধসিয়ে দেয়া সম্ভব।

পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের ভেতরে ঠিক কী আছে, তা প্রকাশ্যে জানা যায়নি এবং স্থাপনাটি চালু কি না, সেটিও স্পষ্ট নয়। বৈশ্বিক পারমাণবিক নজরদারি সংস্থা আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) এখনো এই স্থাপনায় প্রবেশাধিকার পায়নি। আইএইএর মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি মার্চে বলেছিলেন, ইরান ‘সেখানে পারমাণবিক কার্যক্রম চালানোর ইচ্ছার কথা জানিয়েছে’। তিনি আরও বলেন, ‘সবচেয়ে স্পর্শকাতর স্থাপনাগুলো ভূগর্ভে নিয়ে যাওয়ার পদ্ধতিগত পরিকল্পনারই এটি একটি অংশ।’

আইএইএর ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, ইরানের কাছে প্রায় ৪৪০ কেজি ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে। অপ্রমাণিত দাবি অনুযায়ী, এই মজুতের কিছু অংশ বা পুরোটাই পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে রাখা থাকতে পারে। এমনকি হামলার পর নাতাঞ্জ বা ফোরদো থেকে অক্ষত সেন্ট্রিফিউজগুলোও সেখানে সরিয়ে নেয়া হতে পারে।

ফারাগাসো বলেন, ‘এটি সম্ভব যে ইউরেনিয়াম গ্যাস সেন্ট্রিফিউজের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম টানেলগুলোর ভেতরে সরিয়ে মজুত রাখা হয়েছে। আমরা স্থাপনাটির টানেলের প্রবেশপথ দিয়ে অসংখ্য ট্রাকের ধারাবাহিক আনাগোনা দেখেছি। এর অর্থ, কিছু কিছু যানবাহন হয়তো ভেতরে সরঞ্জাম বহন করে নিয়ে গেছে।’ আইএসআইএসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রেসিডেন্ট ডেভিড অলব্রাইট বলেন, ‘উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, ইরান পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে একটি সমৃদ্ধকরণ প্লান্ট বসাতে পারে, যা পারমাণবিক অস্ত্রের জন্য ওয়েপন-গ্রেড ইউরেনিয়াম তৈরি করতে পারবে। যতদূর জানি, এখনো তেমন কিছু ঘটছে না। তবে ভয় হচ্ছে, এটি হয়তো ওয়েপন-গ্রেড ইউরেনিয়াম ধাতু তৈরির জায়গায় পরিণত হবে।’

তেহরানের দাবি, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণভাবে শান্তিপূর্ণ বেসামরিক ব্যবহারের জন্য এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই।

এএম