ড্রোন উৎপাদনে নতুন কৌশল, গাড়ি শিল্পকে কাজে লাগাচ্ছে ফ্রান্স

এমটিও তুতাতিস ড্রোনের একটি মডেল
এমটিও তুতাতিস ড্রোনের একটি মডেল | ছবি: রয়টার্স
0

সামরিক ড্রোন তৈরিতে দেশের গাড়ি শিল্পকে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা এখন বাস্তবায়নের পথে ফ্রান্স। গাড়ি নির্মাতা, যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী ও প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে চুক্তির মাধ্যমে ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা দ্রুতই কারখানার অ্যাসেম্বলি লাইনে রূপ পাচ্ছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

চলতি বছরের শুরু থেকে প্রতিরক্ষা ও গাড়ি শিল্পের মধ্যে অন্তত ছয়টি অংশীদারত্ব ঘোষণা হয়েছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সরকার চাইছে, গাড়ি খাতের বিশাল উৎপাদন সক্ষমতা, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ও কম খরচে পণ্য তৈরির অভিজ্ঞতাকে দ্রুত বেড়ে ওঠা সামরিক ড্রোন খাতের সঙ্গে জুড়ে দিতে। ইউক্রেন ও রাশিয়ার ড্রোন ব্যবহার যুদ্ধের ধরনই বদলে দিয়েছে। এই বাস্তবতায় ফ্রান্স ও তার ইউরোপীয় মিত্ররা ড্রোন উৎপাদনে জোর দিচ্ছে। সেই সঙ্গে সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে ইউরোপকে ওয়াশিংটনের চাপও এই তোড়জোড়ের অন্যতম কারণ।

গাড়ির যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ভালেওর প্রধান নির্বাহী ক্রিস্তফ পেরিলা জুলাইয়ের শেষে সাংবাদিকদের বলেন, ‘এখনই কেন? কারণ, চাহিদা এখনই, ড্রোনের প্রয়োজন এখনই। আর ফ্রান্সে কেন? কারণ, আমাদের নিজেদের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।’ ফরাসি প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা মনে করেন, নিকট ভবিষ্যতে ফ্রান্সের আকাশে বিপুল সংখ্যক ড্রোন মোতায়েনের প্রয়োজন না হলেও যেকোনো সংঘাতের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। জুলাইয়ে ফরাসি সিনেটের প্রতিরক্ষা কমিটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে ফ্রান্সের হাতে থাকা কয়েক হাজার ড্রোনের মজুত ‘একেবারেই অপর্যাপ্ত’।

ভালেও জানিয়েছে, তারা প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হারমাটান এআই-এর জন্য ফ্রান্সে বৈদ্যুতিক ড্রোন মোটর তৈরি করবে। এদিকে গাড়ির যন্ত্রাংশ প্রতিষ্ঠান ফরভিয়া গত সপ্তাহে একটি ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা কোম্পানির সঙ্গে অংশীদারত্ব ঘোষণা করেছে। এর মাধ্যমে ফ্রান্সে মাসে ১ হাজার ইন্টারসেপ্টর ড্রোন তৈরির পরিকল্পনা করছে তারা।

গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রেনো জুন মাসে থালেসের সঙ্গে চুক্তি করেছে। এই চুক্তির লক্ষ্য, ২০২৭ সাল থেকে ‘তুতাতিস’ নামের কামিকাজে ড্রোন প্রতি মাসে ১ হাজার পর্যন্ত উৎপাদন করা। এছাড়া ফরাসি ড্রোন নির্মাতা ডেলেয়ার জার্মানির গাড়ির যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী শেফলারের সঙ্গে যৌথভাবে ফ্রান্সে একটি প্রোডাকশন লাইন তৈরি করছে। এখান থেকে আগামী নভেম্বর নাগাদ দিনে প্রায় ১০০টি ড্রোন উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। রেনো, শেফলার ও ফরভিয়ার এই পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে বছরে সম্মিলিত উৎপাদন দাঁড়াবে ৬০ হাজার ইউনিটে।

যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোনের ব্যবহার নতুন কিছু নয়। তবে ইউক্রেন যুদ্ধে এর ব্যবহার আগের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। বর্তমানে যুদ্ধক্ষেত্রের গতিপ্রকৃতিই নিয়ন্ত্রণ করছে ড্রোন। সম্মুখ সমরের অঞ্চলগুলো ‘কিল জোন’-এ পরিণত হয়েছে। ২০২২ সালে রুশ আগ্রাসনের পর ইউক্রেন দ্রুতই নজরদারি, সম্মুখ সমর ও দূরপাল্লার হামলায় ড্রোন ব্যবহার শুরু করে। প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জুলাইয়ে জানিয়েছিলেন, ২০২৬ সালে ইউক্রেন ১ কোটি ড্রোন উৎপাদন করবে।

ফ্রান্সের প্রতিরক্ষা ক্রয় সংস্থার প্রধান প্যাত্রিক পাইয়ু জানান, বিপুল সংখ্যায় ড্রোন উৎপাদনের জন্য তিনি গাড়ির যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারকদের সঙ্গে বিশেষভাবে কাজ করছেন। তিনি বলেন, ‘কোনো প্রতিরক্ষা স্টার্টআপে ড্রোন বানানো আর প্রোডাকশন-লাইন রোবট দিয়ে বিপুল সংখ্যায় ড্রোন উৎপাদন করা—দুটি এক জিনিস নয়।’ রেনোর প্রধান নির্বাহী ফ্রঁসোয়া প্রভোস্ট জুন মাসে জানিয়েছিলেন, ‘তুতাতিস’ ড্রোনের নকশা নতুন করে করা হচ্ছে। এতে যন্ত্রাংশের সংখ্যা কমিয়ে ইনজেকশন-মোল্ডেড প্লাস্টিক ব্যবহার করা হবে, যাতে বর্তমান ৩ডি-প্রিন্টেড মডেলের চেয়ে সস্তায় ও বেশি পরিমাণে উৎপাদন সম্ভব হয়।

তবে প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা মনে করেন, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোই বড় চ্যালেঞ্জ। ফরাসি প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি গ্রুপ থালেসের প্রধান নির্বাহী প্যাত্রিস কেন এই গ্রীষ্মে বলেন, ‘প্রযুক্তির অগ্রগতির কারণে ড্রোন দ্রুত পরিবর্তনশীল বস্তু।’ ফরাসি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েঁ লেকোরনু গত ডিসেম্বরে ড্রোন খাত গড়ে তুলতে ১৫ কোটি ইউরো (১৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার) বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে ফ্রান্সের ড্রোন শিল্প সমিতির প্রধান আঁতোয়ান লেভেলের মতে, স্বল্প-পাল্লার ড্রোনে অর্থায়নে জার্মানি এখনো ফ্রান্সের চেয়ে এগিয়ে। শিল্পকে সত্যিকার অর্থে চাঙা করতে যথেষ্ট সংখ্যক ফরমায়েশ এখনো আসেনি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এএম