‘যুদ্ধ নয়, শান্তিও নয়’ অচলাবস্থার ইতি টানতে চান পেজেশকিয়ান

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান | ছবি: আল জাজিরা
0

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার ‘যুদ্ধ নয়, শান্তিও নয়’ এই অচলাবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। চলমান যুদ্ধ অবসানে যখন আলোচকরা একটি চুক্তির চেষ্টা করছেন, তখন তার এই মন্তব্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

গতকাল (শনিবার, ৮ আগস্ট) পেজেশকিয়ান বলেন, ‘ইরান এখন শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে এবং এটিই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছানোর উপযুক্ত সময়।’ প্রেসিডেন্টের এই মন্তব্যের প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে ইরান ও ওমান একটি চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছেছে। শান্তিপূর্ণ সময়ে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই কৌশলগত জলপথ দিয়েই পরিচালিত হতো। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরানে হামলা শুরুর পর থেকে তেহরান কার্যত এই প্রণালিতে অবরোধ আরোপ করেছে। ওই যুদ্ধে এ পর্যন্ত ৩ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি রোববার জানান, প্রণালি নিয়ে ওমানের সঙ্গে আলোচনা ‘চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে’। তবে হরমুজ পুনরায় খুলে দেয়া কয়েকটি শর্ত এবং গত জুনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সই হওয়া সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) লঙ্ঘনের ক্ষতিপূরণের ওপর নির্ভর করছে বলে জানান তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার বিষয়টি অস্বীকার করে তিনি বলেন, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে শুধু বার্তা আদান-প্রদান হচ্ছে।

পেজেশকিয়ান আসলে কী বললেন?

ইরানি সংবাদমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে পেজেশকিয়ান বলেন, ‘দেশে এখন সংহতি, শক্তি ও ঐক্য বিরাজ করছে। আমি যতটুকু জানি, এই যুদ্ধে ইরানকে বিজয়ী ও শক্তিশালী হিসেবেই দেখা হচ্ছে।’ যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের বিষয়টি সমাধানে ইরান ও ওয়াশিংটনের একটি চ্যানেল তৈরি করা উচিত ছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষায়, ‘যেকোনো সমঝোতা স্মারকেই লঙ্ঘন ঘটে। যুদ্ধ না করে বরং তখনই লঙ্ঘন সমাধানের জন্য একটি দল গঠন করা উচিত ছিল। ওমানে চলমান আলোচনার মাধ্যমে এখন সেই পথই খোঁজা হচ্ছে। ঈশ্বরের ইচ্ছায় এই ‘যুদ্ধ নয়, শান্তিও নয়’ অবস্থা থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে পারব।’

গত সপ্তাহে ইরান ও ওমান একটি বড় ধরনের সমঝোতার দিকে এগিয়েছে বলে জানা গেছে। এই সমঝোতা অনুযায়ী, উপসাগরে প্রবেশ করা জাহাজগুলো তদারকি করবে ইরান, আর বেরিয়ে যাওয়া জাহাজগুলো ওমানের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। বৃহস্পতিবার ইরান জানায়, ওমানের সঙ্গে হরমুজ প্রণালির নতুন রুটের স্থানাঙ্ক নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে দুই দেশ। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিমকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যখনই ইরানের শর্ত মেনে নেবে, তখনই নিশ্চিতভাবে হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়া হবে।’

তেহরানের শর্ত

শনিবার ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ নতুন কিছু শর্ত ঘোষণা করেছে; যা হরমুজ পুনরায় খুলে দেয়া এবং যুদ্ধ অবসানের প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলতে পারে। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবির প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরিষদের সেক্রেটারি মোহাম্মদ বাঘের জোলগাদর জানান, যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের ‘আচরণ শোধরানো’ পর্যন্ত প্রণালিটি বন্ধ থাকবে। পরিষদের ছয়টি শর্ত হল—ইরানের বিরুদ্ধে সব ধরনের হুমকি ও জাতীয়-ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি অবমাননা বন্ধ করা; লেবানন, ফিলিস্তিন, ইয়েমেন ও ইরাকে ইরান ও তাদের মিত্রদের ওপর হামলা স্থায়ীভাবে বন্ধ করা; ইরানের ওপর নৌ-অবরোধ তুলে নেয়া এবং দেশটির চারপাশ থেকে মার্কিন নৌ ও বিমানবাহিনী প্রত্যাহার করা; দুটি ‘চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধের’ ক্ষতিপূরণ পরিশোধ; বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার; এবং জব্দ থাকা ইরানি সম্পদ নিঃশর্তে ছেড়ে দেয়া।

জুনের সমঝোতা স্মারকে যতটুকু শর্ত ছিল, তার চেয়েও এই দাবিগুলো অনেক ব্যাপক। এতে জলপথটির সঙ্গে বৃহত্তর রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক দাবিগুলোকেও যুক্ত করা হয়েছে। বিশেষভাবে লক্ষণীয়, ইরান ও তাদের মিত্রদের ওপর হামলা বন্ধের দাবিতে লেবাননের পাশাপাশি ফিলিস্তিন, ইয়েমেন ও ইরাকের নামও স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয়েছে।

মূল বাধা কোথায়

সবচেয়ে বড় বাধা হরমুজ প্রণালি নিজেই। ওমানের সঙ্গে ইরানের সমঝোতা হলে জাহাজ চলাচল শুরু হতে পারে; তবে জলপথটির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে দিতে রাজি নয় যুক্তরাষ্ট্র। প্রস্তাবিত এই ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত ফি আরোপের বিষয়েও আপত্তি জানিয়েছে ওয়াশিংটন। অন্যদিকে ইরানের কাছে এই জাহাজ চলাচলের নিয়ন্ত্রণই সবচেয়ে বড় দর-কষাকষির হাতিয়ার। ইরান যেসব জাহাজকে তাদের নির্ধারিত পথ এড়িয়ে যেতে দেখছে, সেগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করায় প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে গেছে। শনিবার যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্য পর্যবেক্ষণ সংস্থা ইউকেএমটিও জানায়, ওমান উপকূলে হরমুজ প্রণালিতে একটি জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। ওই ঘটনায় আগুন ধরলেও পরে তা নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। কে হামলা চালিয়েছে, তা স্পষ্ট নয়।

নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক চাপ

আরেকটি বড় বাধা হল নিষেধাজ্ঞা ও মার্কিন অবরোধ। তেহরানের দৃষ্টিতে অর্থনৈতিক স্বস্তির নিশ্চয়তা ছাড়া হরমুজ খুলে দেয়া মানে হবে সবচেয়ে বড় দর-কষাকষির হাতিয়ারটিই হারানো। আরাঘচি শনিবার জানান, প্রণালি খুলে দেয়ার আগে অন্যান্য শর্তের পাশাপাশি যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করতেই হবে যুক্তরাষ্ট্রকে।

এএম