মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে সৌদি আরবকে সরাসরি ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে ইরান যুদ্ধ। ইয়েমেনের হুথি ও ইরাকি মিলিশিয়াসহ তেহরানের মিত্র গোষ্ঠীগুলোর আক্রমণ, সৌদির তেল অবকাঠামোয় ড্রোন হামলা এবং আঞ্চলিক সংঘাতে রিয়াদের সরাসরি সামরিক পদক্ষেপের কারণে এ যুদ্ধ এখন সৌদি আরবের দোরগোড়ায় এসে পৌঁছেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে আধিপত্য বিস্তার, আঞ্চলিক রাজনীতি, ধর্মীয় ভিন্নতা এবং নিরাপত্তা উদ্বেগকে কেন্দ্র করে ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিনের। ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় দুই দেশ কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করলেও বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক ইস্যুতে আজও দুই দেশের মতবিরোধ বিদ্যমান।
এরকম পরিস্থিতিতে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫-এর আদলে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তান। পবিত্র মক্কা নগরীতে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এই ত্রিপক্ষীয় চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য দেশ। পাকিস্তান ন্যাটোভুক্ত না হলেও যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র। সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের সঙ্গে তাদের প্রতিরক্ষা চুক্তি এই সম্পর্ককে আরও স্পষ্ট করেছে। তাই এ চুক্তির বাস্তব কার্যকারিতা ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে নানা মত রয়েছে।
মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির সঙ্গে ন্যাটোর ৫ নং অনুচ্ছেদের সাদৃশ্য রয়েছে। কারণ এতে স্পষ্টভাবে বলা আছে, এক সদস্যের উপর আক্রমণ মানেই সকল সদস্যের উপর আক্রমণ। কিন্তু চুক্তিটি পরীক্ষামূলক ক্ষেত্র হবে সৌদি আরব। সম্প্রতি হুথি অথবা ইরান বা ইরাকে থাকা ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো দেশটিতে যে আক্রমণ করছে সেই বিবেচনা থেকে।
তুরস্ক ও পাকিস্তান ইরানের প্রথাগত মিত্র দেশ না হলেও প্রতিবেশী হিসেবে ইরানের সঙ্গে তাদের দ্বিপক্ষীয় ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। তবে ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে তারা ইরানের থেকে পশ্চিমা বলয়ের সঙ্গে বেশি যুক্ত।
বিশ্লেষকরা বলছেন, চুক্তিটি সৌদিকে মিত্রদেশ যুক্তরাষ্ট্রের ওপর তাদের সামরিক সুরক্ষার নির্ভরতা কমাবে। ন্যাটোতে যুক্তরাষ্ট্রের পরই তুরস্কের সামরিক শক্তি দ্বিতীয় বৃহত্তম। অন্যদিকে পাকিস্তানই একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রধারী মুসলিম দেশ।
আরেকদল বিশ্লেষকের মতে, এই শক্তিশালী মিত্ররা সৌদি আরবের প্রতিরোধ ক্ষমতাকে জোরদার করে। ক্রমবর্ধমান ইরানি হুমকির বিরুদ্ধে একটি ঐক্যবদ্ধ সুন্নি-নেতৃত্বাধীন সামরিক ফ্রন্ট গড়ে তোলে। যদিও তুর্কি কর্তৃপক্ষের দাবি, চুক্তিটি কোনো নির্দিষ্ট পক্ষের বিরুদ্ধে নয়। সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জোর দিয়ে বলছে, এটি কোনো সামরিক অক্ষ বা সাম্প্রদায়িক জোট প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা নয়।
আরেকদিকে, সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিকে কাগজের চুক্তি বলে অভিহিত করেছে ইরান। তেহরানের দাবি, এ ধরনের সামরিক চুক্তি সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হবে। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর দীর্ঘদিনের একপাক্ষিক আস্থার মতো এই ত্রিপক্ষীয় চুক্তিকেও অর্থহীন বলে মন্তব্য করা হয়েছে।




