বাবার স্বপ্নের দেশ পাকিস্তানকে কেন প্রত্যাখ্যান করেছিলেন জিন্নাহর একমাত্র মেয়ে?

ডিনা ওয়াডিয়া
ডিনা ওয়াডিয়া | ছবি: সংগৃহীত
0

১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট, নবগঠিত পাকিস্তানে সাজসাজ রব। উৎসবের বন্যা, উচ্ছ্বাসের ফোয়ারা। বহুল আরাধ্য দেশ পেয়ে মানুষ মিষ্টি বিলিয়ে বেড়াচ্ছে। ব্রিটিশ ভারতের শেষ ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেনের সঙ্গে ছাদখোলা গাড়িতে পুরো করাচি ঘুরলেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। স্বতঃস্ফূর্ত জনসমুদ্রের প্রাণভরা অভিবাদনে সিক্ত হয়ে পরদিন শপথ নিলেন দেশটির প্রথম গভর্নর জেনারেল হিসেবে।

পাকিস্তানের জাতির পিতার দম ফেলবার ফুসরত নেই। সকালে শপথ তো দুপুরে সভা, বিকেলে আবার সৌজন্য সাক্ষাৎ। সন্ধ্যা গড়ালেই নৈশভোজ। সমস্ত রাষ্ট্রীয় আয়োজনের মধ্যমণি তখন একজনই। নতুন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতার এসব ব্যস্ততা সহজ অনুমেয়। ওদিকে মাত্র এক হাজার কিলোমিটার দূরের শহর বোম্বেতে (বর্তমান মুম্বাই) নিভৃতে ঘরকন্না সামলাচ্ছেন ডিনা ওয়াডিয়া নামের ২৮ বছর বয়সী এক নারী। করাচির আনন্দ ছোঁয়নি তাকে।

তার বাবার নামও মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতার ঔরসজাত কন্যা রয়ে গেলেন জন্মভূমি ভারতেই। প্রথমবারের মতো পাকিস্তানে পা রাখেন বাবার মৃত্যুর খবর পেয়ে।

পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা ও তার বাবা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং ফুফু ফাতিমা জিন্নাহর সঙ্গে তরুণী ডিনা ওয়াডিয়া (ডানে)। | ছবি: সংগৃহীত

পাকিস্তানের নাগরিকত্ব তার কাছে ছিল কেবলই একটি ‘হ্যাঁ’র অপেক্ষা। কিন্তু সেই একটিমাত্র শব্দ কখনোই উচ্চারণ করেননি ডিনা। কেন? উত্তর খুঁজতে হবে ইতিহাসের গভীরে। রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষের বিপরীতে অনুভব করতে হবে বিভাজনের বেদনাকে। ইতিহাস যে জিন্নাহকে আজ চেনে, তার উত্থান আসলে কীভাবে? অনন্তকালের জন্য উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বীজ বুনে দিয়ে যাওয়া মানুষটি কি চিরকালই ‘কায়েদ-এ-আজম’ পরিচয়টা বহন করতেন? উত্তর হলো, ‘না’!

রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে জিন্নাহ ছিলেন অবিভক্ত ভারতীয় কংগ্রেসের নেতা। হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি রক্ষায় অবদানের জন্য কবি সরোজিনী নাইড়ু একবার তাকে দুই সম্প্রদায়ের ঐক্যের দূত আখ্যা দিয়েছিলেন।

কিন্তু ১৯৪০-এর দশকে এসে সম্পূর্ণ বিপরীত চরিত্রের এক জিন্নাহর উত্থান দেখল অবিভক্ত ভারতের রাজনীতি। টিমটিমে আলো হয়ে জ্বলতে থাকা সাম্প্রদায়িক সংগঠন মুসলিম লীগ তার নেতৃত্বে হয়ে উঠল দাবানল। লাহোর, দিল্লি, কলকাতা, ঢাকা, পাঞ্জাবের মতো বড় শহর ছাপিয়ে নোয়াখালী, বরিশাল, ফরিদপুরের নিভৃত গ্রামগুলোতে পর্যন্ত দুর্বার সংগঠন গড়ে উঠল মুসলিম লীগের। মানুষের মাথায় ঢুকে গেল বিভাজনের বীজ। দাবি উঠলো আলাদা ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের। অনড় জিন্নাহর রাজনৈতিক অভিলাষের সামনে অসহায় হয়ে পড়ল সম্প্রীতির সমস্ত প্রচেষ্টা। জন্ম নিলো দুটি আলাদা দেশ।

তবে দ্বিজাতিতত্ত্বের সফল নায়ক জিন্নাহ চরম ব্যর্থ হয়েছিলেন পারিবারিক জীবনে। নিজের মেয়েই কখনো সায় দেননি বাবার রাজনৈতিক মতাদর্শে।

জিন্নাহ পরিবারে ফাটলের শুরু ভারত বিভাজনের প্রায় এক দশক আগে। ১৯৩৮ সালে ১৯ বছর বয়সী ডিনা জানান, পার্সি তরুণ নেভিল ওয়াডিয়াকে তিনি ভালোবাসেন। বাবার সঙ্গে দূরত্বের শুরু তখনই। জিন্নাহর একসময়কার সহযোগী মোহাম্মেদালি কারিম চাগলার মতে, পার্সি ধর্মাবলম্বী নেভিলের সঙ্গে মেয়ের সম্পর্ক কিছুতেই মানতে পারেননি পাকিস্তান আন্দোলনের কাণ্ডারি। মেয়েকে বলেছিলেন লাখ লাখ সুযোগ্য ভারতীয় মুসলিমের মধ্যে কাউকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিতে। মেয়েও কড়া জবাব দিয়েছিলেন মুখের ওপর। মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, জিন্নাহর স্ত্রী (ডিনার মা) রুট্টি পেটিটও ছিলেন একজন পার্সি। বিয়ের পরে অবশ্য ধর্ম পরিবর্তন করে রত্নাবাই জিন্নাহ নাম গ্রহণ করেন তিনি।

মেয়ের এই অকাট্য, তীক্ষ্ণ যুক্তি সেদিন হয়ত জিন্নাহকে তর্কে হারিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু সম্পর্কের ফাটল আর জোড়া লাগেনি। পছন্দের মানুষটিকেই বিয়ে করেন ডিনা।

ওই সময়কার বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও ঘনিষ্ঠজনদের সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায়, পারিবারিক জীবনে নিঃসঙ্গ জিন্নাহ মেয়েকে একাধিকবার সেধেছিলেন নিজের হাতে গড়া দেশে চলে আসতে। কিন্তু ডিনার সায় মেলেনি। বাবার হাতে গড়া নতুন দেশে হয়ত তিনি রাজকীয় সম্মান পেতেন। কিন্তু তার কাছে বড় ছিল দুই সন্তান আর বোম্বেতে থেকে যাওয়া স্বজনদের ভালোবাসা। স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর যুক্তরাষ্ট্রে চলে গেলেও বোম্বেই ছিল তার নিজের শহর। বহুবার সে কথা প্রকাশ্যে বলেছেন তিনি।

অনুগামিতা কিংবা বৈপরীত্য রাজনীতির চিরাচরিত বৈশিষ্ট্য। বহুক্রোশ দূরের অচেনা মানুষকে প্রিয় নেতার জন্য সবটুকু উজাড় করে দিতে দেখা যায়। কিন্তু ডিনার মতো বাবার রাজনৈতিক আদর্শকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাতে পারেন ক’জন? তার জায়গায় অন্য কেউ থাকলে কি পারতেন স্বাধীন দেশের প্রথম গভর্নর জেনারেলের মেয়ে হয়েও রাজসিক সম্মান থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে? উচ্চাভিলাষী হলে ডিনাই হয়ত বাবার রাজনৈতিক উত্তরসূরী হওয়ার দৌড়ে নামতেন!

জিন্নাহর সমসাময়িক রাজনীতিবীদদের অনেকেই বলেন, মেয়ের এই সিদ্ধান্ত জিন্নাহকে ভীষণভাবে ব্যথিত করেছিল। কাঙ্ক্ষিত দেশ পেলেন, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদ পেলেন, কিন্তু নিজের গড়া ভূখণ্ডে আনতে পারলেন না একমাত্র সন্তানকে।

অবশ্য কোনো কোনো ঐতিহাসিক সূত্র বলছে, মেয়ের সঙ্গে জিন্নাহর দূরত্ব বিচ্ছেদের করুণ উপাখ্যান নয়, বরং তিনিই ডিনাকে দূরে ঠেলে দিয়েছেন। বিভাজন নিয়ে ভারতবর্ষ যখন উত্তাল, জিন্নাহ তখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি রাজনৈতিক চরিত্র। এমনই এক সন্ধিক্ষণে দূরারোগ্য যক্ষ্মায় আক্রান্ত হন তিনি। খবরটা চেপে গিয়ে সবার থেকে দূরত্ব বাড়িয়ে দেন তিনি। জানতে দেননি ব্রিটিশ সরকারের উচ্চপদস্থ লোকজনকেও। কারণ জিন্নাহর ভয় ছিল তার অসুস্থতার খবর ছড়িয়ে পড়লে ভারতভাগ বিলম্বিত হতে পারে। এজন্যই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই ভারতে থাকা মেয়েকে ভিসা দেননি জিন্নাহ। কোনো কোনো বিশ্লেষক মনে করেন, হয়ত মেয়েকে দূরারোগ্য ব্যাধির সংক্রমণ থেকে দূরে রাখতে চেয়েছিলেন তিনি।

প্রথম পাকিস্তান সফরে ডিনা ওয়াডিয়া (একেবারে বামে) | ছবি: সংগৃহীত

দেশভাগের পর ডিনা তার বাবাকে প্রথম ও শেষবারের মতো দেখেন ১৯৪৮ সালের সেপ্টেম্বরে। লাখো মানুষের ভিড়ে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর প্রতি শেষবারের মতো শ্রদ্ধা নিবেদন করতে ছুটে গিয়েছিলেন করাচিতে। এরপর মাত্র আরেকবার ২০০৪ সালে পাকিস্তানে গিয়েছিলেন জিন্নাহ-তনয়া।

মাঝের এই দীর্ঘ সময়টা বুকে পাথরচাপা দিয়েছিলেন ডিনা ওয়াডিয়া। বাবার বিষয়ে সাক্ষাৎকার দেননি বললেই চলে। ২০১৭ সালে ডিনার মৃত্যুর পর লেখা এক শোকবার্তায় তাকে ‘রহস্যে ঘেরা’ ব্যক্তিত্ব বলে অভিহিত করা হয়। রহস্য তো বটেই! বিংশ শতাব্দীতে ঘটে যাওয়া ইতিহাসের চরম উত্তাল ঘটনা দেশভাগ। খুব কাছ থেকে দেখেও বিষয়টি নিয়ে কোনো কথাই বলতেন না তিনি।

মুম্বাইয়ের মালাবার হিলে আজও ইতিহাসের সাক্ষ্য দেয় ১৯৩৬ সালে তৈরি জিন্নাহ হাউস। এই বাড়িতে দিনের পর দিন মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহেরুদের সঙ্গে রাজনৈতিক বৈঠক করেছেন পাকিস্তানের বাবা-এ-কওম। এখানে কেটেছে ডিনা ওয়াডিয়ার শৈশব। আরব সাগরের মুম্বাই বালুকাবেলায় দাঁড়িয়ে থাকা বাড়িটি থেকে নোনাজল গড়িয়ে কখনো কি আছড়ে পড়েছে করাচি প্রান্তে? অথবা বিপরীত দিক থেকে আসা শোঁ-শোঁ হাওয়া কখনো কি বয়ে এনেছে এক নিঃসঙ্গ পিতার হাহাকার?

দেশভাগের পর ভারত সরকার জিন্নাহ হাউসকে শত্রু সম্পত্তি হিসেবে চিহ্নিত করে। বছরের পর বছর বাড়িটি ফিরে পেতে আইনি লড়াই চালিয়ে গেছেন ডিনা। তার যুক্তি ছিল, পাকিস্তান নয় বরং মেয়ে হিসেবে জিন্নাহর সম্পত্তির দাবিদার তিনিই। তবে সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি।

বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করে মেঘবতী সুকর্ণপুত্রীকে আমরা ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট হতে দেখেছি। কিন্তু এক্ষেত্রে একদমই ব্যতিক্রম চরিত্র ডিনা ওয়াডিয়া। জন্মভূমিকে ভাগ করেছিলেন তার বাবা, কিন্তু প্রিয় শহর আর মানুষের টানে তিনি থেকে গেলেন বোম্বেতে। ওদিকে শৈশবের স্মৃতিমাখা বাড়িটি কেড়ে নিয়ে ভাগ্য তার সঙ্গে খেলল এক নির্মম খেলা।

বাবা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সঙ্গে তরুণী ডিনা ওয়াডিয়া। | ছবি: সংগৃহীত

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ কি তবে এক ব্যর্থ পিতার নাম? উত্তর খোঁজার দায় ইতিহাসের। কারণ ইতিহাসের পাতাই সাক্ষ্য দেয়, তারই নেতৃত্বে সম্প্রীতির বদলে বিভাজনকে পুঁজি করে ভাগ হয় অভিন্ন সংস্কৃতি। লাইন অব কন্ট্রোলের কাঁটাতার কেড়ে নিয়েছে বহু মানুষের বাস্তু। অন্যদিকে বাবা-এ-কওমের ঘরে এক অদৃশ্য ফাটল। নিঃসঙ্গ অবস্থায় মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে হয় তাকে। একমাত্র সন্তানের শৈশব স্মৃতি গড়াগড়ি খায় আদালতের বারান্দায়।

২০১৭ সালের নভেম্বরে ৯৮ বছর বয়সে অনেক প্রশ্ন আর রহস্য নিয়ে চিরবিদায় নেন ডিনা ওয়াডিয়া।

লেখক: আহমেদ শারজিন শরীফ, কলামিস্ট। তথ্যসূত্র: দ্য কুইন্ট, ম্যাগ দ্য উইকলি (আ ফেয়ারওয়েল টু জিন্নাহ’স ডটার) , উইকিপিডিয়া, গালফ নিউজ (ডিনা ওয়াডিয়া ফট আ লং লিগ্যাল ব্যাটল ফর জিন্নাহ হাউস), দ্য ট্রিবিউন ইন্ডিয়া, হিন্দুস্তান টাইমস।

এনএইচ