চলতি বছরের শেষের দিকে অনুষ্ঠেয় গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের আগে বিপুলসংখ্যক ইসরাইলি নাগরিক দেশ ছাড়ছেন, যা কয়েক দশক ধরে চলা ধারাকে উল্টে দিয়েছে। চলতি মাসের শুরুতে ইসরাইলের কর কর্তৃপক্ষ প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, দেশটির সরকার যত বেশি কট্টর ও ডানপন্থি হয়ে উঠছে, তত বেশি উচ্চশিক্ষিত ও সম্পদশালী নাগরিক দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। চলে যাওয়া ব্যক্তিরা বলছেন, নিজ দেশকে তারা আর চিনতে পারছেন না।
গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে পূর্ববর্তী বছরগুলোর তুলনায় দেশ ছাড়ার হার অনেক বেশি ছিল। শুধু তা-ই নয়, যারা দেশ ছেড়েছেন, তারা মূলত উচ্চ করদাতাদের শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। উদারপন্থি হিসেবে পরিচিত অনেক ইসরাইলি মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার দেশটিকে ধর্মনিরপেক্ষতার পথ থেকে সরিয়ে দিচ্ছে এবং বিচার বিভাগসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা খর্ব করছে।
২০২৩ সালে বিচার বিভাগের ক্ষমতা খর্ব করার সরকারি উদ্যোগের বিরুদ্ধে লাখো ইসরাইলি রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেছিলেন। সরকারের এমন কট্টর নীতির কারণে ক্ষুব্ধ শিক্ষিত সমাজকে আরও বেশি ভাবিয়ে তুলেছে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামাসের হামলা এবং এর জবাবে গাজায় ইসরাইলের চালানো গণহত্যা। গাজায় ইসরাইলি হামলায় এ পর্যন্ত ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। অঞ্চলজুড়ে একাধিক ফ্রন্টে যুদ্ধ চললেও অনেক ইসরাইলি এই অন্তহীন সংঘাত এবং সরকারের ‘বিজয়ের’ দাবি পূরণ করতে না পারার ব্যর্থতায় হতাশ হয়ে পড়েছেন। তারা মনে করছেন, এক চিরস্থায়ী যুদ্ধের চক্রে আটকে গেছেন তারা।
তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের গত আগস্টের এক জরিপেও দেখা গেছে, ইসরাইল ছাড়ার এই প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে এবং দেশত্যাগীদের বেশির ভাগই শিক্ষিত ও সচ্ছল। সেন্ট্রাল ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকসের তথ্য ব্যবহার করে করা এই গবেষণায় দেখা যায়, গত তিন বছরে প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার ইসরাইলি দেশ ছেড়েছেন। এর মধ্যে ২০২৩ সালে ৮৬ হাজার ৫০০ জনের বেশি এবং ২০২৪ ও ২০২৫ সালে প্রায় একই সংখ্যক নাগরিক দেশ ছেড়ে চলে গেছেন।
ইসরাইলি পার্লামেন্টের অভিবাসন, পুনর্বাসন ও প্রবাসীবিষয়ক কমিটির প্রধান এবং বিরোধীদলীয় নেতা গিলাদ কারিব সতর্ক করে বলেছেন, ইসরাইল এখন দেশত্যাগের এক ‘সুনামি’ প্রত্যক্ষ করছে। কিন্তু সরকার এটি মোকাবিলায় কিছুই করছে না।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরাইলে যারা দেশ ছেড়ে চলে যান, তাদের সামাজিকভাবে বাঁকা চোখে দেখা হয়। বিশেষ করে ডানপন্থিরা মনে করেন, বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ইহুদিদের ইসরাইলে চলে আসাই স্বাভাবিক প্রবণতা। ১৯৭০-এর দশকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইতঝাক রবিন দেশত্যাগীদের ‘ভীরুদের দল’ বলে অভিহিত করেছিলেন। হিব্রু ভাষায় ইসরাইলে আসাকে বলা হয় ‘আলিয়া’ যার অর্থ ‘উত্থান’, আর চলে যাওয়াদের বলা হয় ‘ইয়ারদিম’ যার অর্থ ‘পতন’।
ইসরাইলি জনমিতিবিদ ও পরিসংখ্যানবিদ সের্জিও দেল্লা পেরগোলা সংবাদমাধ্যম ‘আল-জাজিরা’-কে বলেন, এর আগেও সাময়িক অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে মানুষ দেশ ছেড়েছিল, তবে দীর্ঘ সময় ধরে এমন বিপুলসংখ্যক নাগরিকের দেশ ছাড়ার ঘটনা উদ্বেগজনক। তিনি বলেন, ‘এবার অর্থনীতির ভূমিকা কতটা, তা স্পষ্ট নয়। অনেকে ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের জন্য যেতে পারেন, তবে বড় অংশটি যাচ্ছে নিরাপত্তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা এবং দেশের রাজনৈতিক গতিপথ নিয়ে উদ্বেগের কারণে।’
পেরগোলা আরও বলেন, ইতামার বেন-গভিরের মতো চরমপন্থি রাজনীতিকদের উত্থান দেশের মেরুকরণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বেন-গভির সম্প্রতি গাজায় প্রতি রাতে ৩০ থেকে ৪০ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
সিটি সেন্ট জর্জস, ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অধ্যাপক মাইকেল বেন-গাদ বলেন, ইসরাইলের মতো নতুন অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির জন্য তরুণ, শিক্ষিত ও উদারপন্থি নাগরিকদের ধরে রাখা অত্যন্ত জরুরি।
উত্তরাঞ্চলীয় ইসরাইলের ওরানিম কলেজের অভিবাসন ও জনমিতি বিষয়ের অধ্যাপক লিলাক লেভ আরি বলেন, বর্তমানে মূলত উচ্চশিক্ষিত ও সফল তরুণ পরিবারগুলো দেশ ছাড়ছে। বিচার বিভাগীয় সংস্কার, সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবেশ এবং যুদ্ধই এর প্রধান কারণ। তিনি বলেন, ‘আমরা দক্ষ মানুষ হারাচ্ছি। তবে এখনো ভালো মানুষ আছেন। কিন্তু গত তিন বছর ধরে চলা এই দেশত্যাগের ঢেউ আমাদের জন্য আশঙ্কাজনক।’
রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ শির হেভার বলেন, ইসরাইল থেকে এই গণ-অভিবাসন একটি ‘মহা ঘটনা’। তবে অনেকে এটি ভুল দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন। তিনি বলেন, মূলত চিকিৎসক বা উচ্চ আয়ের পেশাজীবীদের চলে যাওয়া নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, কিন্তু নার্স বা অন্যান্য জরুরি কর্মীদের চলে যাওয়ার দিকে নজর দেয়া হচ্ছে না, যা ইসরাইলের জন্য সমান ক্ষতিকর।
হেভার আরও বলেন, ‘ইসরাইলি অর্থনীতিবিদরা বলেন যে গবেষণা ও উন্নয়নে শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার ওপরই ইসরাইল রাষ্ট্রের টিকে থাকা নির্ভর করে। কিন্তু কেন? অন্য দেশের জন্য এটি সত্য না হলেও ইসরাইলের জন্য কেন সত্য? সম্ভবত এর কারণ, ইসরাইল মূলত একটি ঔপনিবেশিক প্রকল্প এবং এর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এই শ্রেষ্ঠত্ব প্রয়োজন।’





