প্রতিবেদনে বলা হয়, এই প্রবণতা ঠেকাতে সরকার গত দুই বছরে কয়েক দফা কড়াকড়ি করেছে। তবু অনলাইনে নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা নানা ওষুধ সহজে পাওয়া যাচ্ছে, আর একটির ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়লে তরুণদের একটি অংশ দ্রুত বিকল্প খুঁজে নিচ্ছে।
বিবিসির কাছে কথা বলা ১৪ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী (পরিচয় গোপন রাখতে নাম বদলে শাওমেই) জানায়, পরীক্ষার চাপের মধ্যে সে কাশির ওষুধসহ বিভিন্ন প্রেসক্রিপশন ওষুধ অনলাইনে সংগ্রহ করে সেবন শুরু করেছিল। সে বলে, ‘পড়াশোনার চাপ বেশি লাগলে, পরীক্ষায় খারাপ করলে বা বাবা-মায়ের সঙ্গে ঝগড়া হলে এসব ওষুধ নিতাম। আমি বাস্তবতা থেকে পালাচ্ছিলাম।’ বিবিসি বলছে, বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চ্যাটরুমে আরও অনেক কিশোর-কিশোরীর কাছ থেকে তারা একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা শুনেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বেশি মাত্রায় সেবনে কিছু ওষুধে হ্যালুসিনেশন, সমন্বয়ক্ষমতা ব্যাহত হওয়ার মতো গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি থাকে। চ্যাটরুমে একে অপরকে ‘ঘুমিয়ে পড়লে ঠিক হয়ে যাবে’ ধরনের পরামর্শ দেয়ার ঘটনাও নজরে এসেছে যা এ ইস্যুতে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
কতটা বড় পরিসরে এই সমস্যা ছড়িয়েছে, সে বিষয়ে সরকারি পর্যায়ে বিস্তারিত তথ্য সীমিত। তবে পরিস্থিতি এমন যে, শাওমেই শুরুতে যে কাশির ওষুধ ব্যবহার করেছিল, সেটির অনলাইন বিক্রি ঠেকাতে সরকার দুই বছর আগে দেশব্যাপী অভিযান চালিয়ে সেটিকে সাইকোট্রপিক ওষুধ হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করে। এতে চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া সেটি কেনা কঠিন হয়। এরপর চলতি বছরের এপ্রিলে কর্তৃপক্ষ আরেকটি ওষুধের ব্যবহার বাড়তে দেখার পর প্রেসক্রিপশন ও ফার্মেসিতে বিক্রির নিয়ম আরও কড়া করা হয়। তবু বিবিসি জানিয়েছে, অনলাইন চ্যাটরুমে তুলনামূলক কম দামে ওই ধরনের ওষুধ বিক্রির প্রস্তাব পাওয়া গেছে।
চীনের বিচার মন্ত্রণালয়ের ক্রাইম প্রিভেনশন ইনস্টিটিউটের জন্য ২০২৫ সালে লেখা একটি গবেষণাপত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা বিভিন্ন পদার্থ তুলনামূলক সহজে পাওয়া যায়। আবার কোনো একটি ওষুধ নিয়ন্ত্রণে এলে তরুণদের একটি অংশ দ্রুত বিকল্পে দিকে চলে যায়। অনলাইনে নজরদারি এড়াতে ওষুধের ভিন্ন নাম ব্যবহার করার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।
চীনের ন্যাশনাল নারকোটিকস কন্ট্রোল কমিশন সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে জানা যায়, দেশটিতে প্রেসক্রিপশন ওষুধের অপব্যবহার একটি বাড়তে থাকা সমস্যা এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে এটি বিশেষভাবে বাড়ছে। একই সময়ে চীনের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৩৫ বছরের কম বয়সী নতুন শনাক্ত মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৪১ শতাংশ কমেছে যা দেখায় অবৈধ মাদক দমনে অগ্রগতি হলেও প্রেসক্রিপশন ওষুধের অপব্যবহার নতুন ঝুঁকি হিসেবে সামনে আসছে।
সমাজবিজ্ঞানী ও ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর সোশ্যাল অ্যানথ্রোপোলজির পরিচালক সিয়াং বিয়াও বিবিসিকে বলেছেন, চাপের একটি বড় অংশ আসে পরিবার থেকে। তার ভাষায়, একসন্তান নীতি দীর্ঘদিন চলার প্রেক্ষাপটে অনেক পরিবারে একমাত্র সন্তানই ‘সব প্রত্যাশা’ কাঁধে বহন করে। তিনি আরও বলেন, ‘চীনের কিশোরদের বড় একটি অংশ প্রতিদিন দীর্ঘ সময় স্কুলে থাকে, সামাজিক সম্পর্ক গড়ার সুযোগ তুলনামূলক কম—এ ধরনের বিচ্ছিন্ন পরিবেশ মানসিক চাপ বাড়াতে পারে।’
প্রতিবেদনে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা নিয়ে সরকারের উদ্যোগের কথাও বলা হয়েছে। ২০২৩ সালে চীনের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক এক গবেষণায় বলা হয়, দেশটিতে প্রায় ৯ কোটি ৫০ লাখ মানুষ বিষণ্নতায় ভুগছেন, যাদের মধ্যে ৩০ শতাংশের বেশি ১৮ বছরের কম বয়সী। সরকারি পরিকল্পনায় স্কুলে কাউন্সেলিং রুম, প্রতি কাউন্টিতে অন্তত একটি হাসপাতালে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং আরও মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী তৈরির লক্ষ্য রাখা হয়েছে। স্টেট কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, এখন ৯২ শতাংশ প্রাথমিক স্কুল ও ৯৫ শতাংশ জুনিয়র মিডল স্কুলে কাউন্সেলর আছেন। তবে শিশুরোগ মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের ঘাটতি রয়ে গেছে। দ্য ল্যানসেটে ২০২০ সালে প্রকাশিত এক গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে বিবিসি জানায়, দেশটিতে যোগ্য শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সংখ্যা ছিল প্রায় ৫০০, যাদের বড় অংশ বড় শহরকেন্দ্রিক।





