চীনের হামলার আশঙ্কায় পেংঘু দ্বীপপুঞ্জ; জোর প্রস্তুতি নিচ্ছে তাইওয়ানের সেনারা

তাইওয়ানের সামরিক বাহিনীর ড্রিলের সময়
তাইওয়ানের সামরিক বাহিনীর ড্রিলের সময় | ছবি: রয়টার্স
0

চীনের সম্ভাব্য প্রথম হামলা (ফার্স্ট স্ট্রাইক) ঠেকাতে জোর প্রস্তুতি নিচ্ছে তাইওয়ানের সামরিক বাহিনী। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পেংঘু দ্বীপপুঞ্জে মোতায়েন করা সেনারা যেকোনো পরিস্থিতির জন্য নিজেদের প্রস্তুত রাখছেন। সামরিক বিশ্লেষক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মতে, বেইজিং তাইওয়ানে সামরিক অভিযান চালালে এই পেংঘু দ্বীপপুঞ্জই হবে তাদের প্রথম লক্ষ্যবস্তু। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

তাইওয়ান প্রণালির পেংঘু দ্বীপপুঞ্জে সম্প্রতি ভোরে এক সামরিক মহড়ার আয়োজন করা হয়। অন্ধকার থাকতেই তাইওয়ানি সেনারা সবুজ প্লাস্টিকের ক্যানিস্টার থেকে ১০৫ মিলিমিটারের চকচকে গোলা বের করেন। ৪টি ট্যাংকে গোলাবারুদ লোড করার পর তারা নিস্তব্ধ হয়ে নির্দেশের অপেক্ষায় থাকেন।

পেংঘু দ্বীপপুঞ্জে অবস্থান করা হাজার হাজার সেনার কাজ মূলত চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়া। বেইজিং যদি হামলার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে এই সেনারাই থাকবেন তাইওয়ানের সুরক্ষার প্রথম সারিতে। মনোরম সৈকত ও প্রবাল প্রাচীরের জন্য পরিচিত পেংঘুর ৯০টি দ্বীপ তাইওয়ানের মূল ভূখণ্ডের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পেংঘু তাইওয়ানের নিয়ন্ত্রণে থাকলে বেইজিংয়ের মূল ভূখণ্ডমুখী হামলাকারী নৌবহরকে ঠেকানো সহজ হবে। তাই নিজেদের জাহাজ ও যুদ্ধবিমানগুলোকে সুরক্ষিত রাখতে বেইজিংকে প্রথমেই পেংঘু দখল করতে হবে অথবা এখানকার দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ধ্বংস করতে হবে।

তাইওয়ানের সামরিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল ডিফেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি রিসার্চের গবেষক সু জু-ইয়ুন বলেন, পিএলএর (পিপলস লিবারেশন আর্মি) জাহাজগুলো যদি পেংঘুকে এড়িয়ে তাইওয়ানে হামলার চেষ্টা করে, তবে পেংঘু থেকে ছোঁড়া ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে সেগুলো ধ্বংস হতে পারে। তিনি বলেন, ‘এটি পিএলএকে তাইওয়ানে হামলার আগে পেংঘুতে হামলা করতে বাধ্য করবে।’

তাইওয়ানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, পেংঘুতে সিউং ফেং-৩ এর মতো দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করার ফলে চীনের উপকূলীয় এলাকায় বেইজিংয়ের সেনা সমাবেশ করা কঠিন হয়ে পড়বে। এমনকি প্রণালি পার হওয়ার আগেই তাদের ওপর আঘাত হানা সম্ভব হবে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেন, পেংঘু যদি হাতছাড়া হয়, তবে পুরো তাইওয়ান প্রণালি কার্যত চীনের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে।

তাইপেই পেংঘুর প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদারে বিপুল বিনিয়োগ করছে। যুদ্ধের সময় এখানকার ১ লাখ ১০ হাজার বাসিন্দার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন কর্মসূচি নেয়া হচ্ছে। অন্যদিকে বেইজিং ক্রমাগত সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করলেও তাইওয়ানের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ পরিহার করেনি। মার্কিন কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২০২৭ সালের মধ্যে তাইওয়ান দখলের জন্য পিএলএকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।

পেংঘু দ্বীপপুঞ্জের সুরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করার বিষয়ে চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সরাসরি কোনো মন্তব্য করেনি। তবে মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জিয়াং বিন চলতি বছর সাংবাদিকদের বলেন, তাইওয়ানের এই প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা ‘অত্যন্ত হাস্যকর ও বিভ্রান্তিকর’। যুদ্ধ উসকে দিলে তাইপেই ‘সম্পূর্ণ ধ্বংসের’ মুখোমুখি হবে বলেও তিনি সতর্ক করেন।

এদিকে গত বছর মার্কিন, তাইওয়ানি ও জাপানি সাবেক সামরিক কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে এক যুদ্ধ মহড়া (ওয়ার গেম) অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে দেখা যায়, আকস্মিক হামলার মাত্র এক দিনের মাথায় পেংঘুর পতন ঘটে। এই দ্রুত আত্মসমর্পণ তাইওয়ানি অংশগ্রহণকারীদের চমকে দিয়েছিল। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েলিংটন কু-এর গত বছরের একটি বক্তব্যের কথা উল্লেখ করে। তিনি বলেছিলেন, সরকার এই ধরনের মহড়ার ফলাফল বিবেচনা করেই তাদের প্রতিরক্ষাপরিকল্পনা সাজায়।

চীনের সামরিক আগ্রাসন ঠেকানোর প্রস্তুতির পাশাপাশি পেংঘুর সাধারণ নাগরিকেরাও নিজেদের দায়িত্ব পালনে তৈরি হচ্ছেন। ইয়েন মিন-চিং নামের সাবেক এক পুলিশ কর্মকর্তা এখানকার বাসিন্দাদের নাগরিক প্রতিরক্ষা কর্মসূচিতে যোগ দিতে উৎসাহিত করছেন। হুক্সি টাউনশিপের প্রধান চেন চেন-চুং বলেন, ‘আমাদের অবশ্যই সংকটকাল সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।’ যুদ্ধের সময় খাদ্যসামজ্ঞী বিতরণ ও প্রতিরক্ষা বুথ তৈরিতে সাধারণ নাগরিকেরা কাজ করবেন।

ইউএস নেভাল ওয়ার কলেজের গবেষক ইয়ান ইস্টন বলেন, অতীতেও এই দ্বীপপুঞ্জ তাইওয়ানে আগ্রাসনের মূল পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। তিনি বলেন, ‘আমার ধারণা, কঠিন পরিস্থিতি এলে পিএলএ দেখবে এই দ্বীপগুলো দখল করা মোটেও সহজ নয়।’

এএম