পশ্চিমবঙ্গের শতাব্দী প্রাচীন দুর্গা পূজাগুলির মধ্যে অন্যতম কলকাতার ৩৬, রাজা নবকৃষ্ণ স্ট্রিটের শোভাবাজার রাজবাড়ীর পূজা। ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর রাজা নবকৃষ্ণ দেব উত্তর দিকের বাড়িতে এই পূজার সূচনা করেন। ১৭৯০ সালে সম্পত্তি ভাগাভাগির পরে রাজবাড়ির দক্ষিণ দিকেও পূজার আয়োজন শুরু হয়।
কৃষ্ণ নবমীর তিথি মেনে গেল রোববার থেকে দক্ষিণ দিকের শোভাবাজার রাজবাড়ির পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। ঘট পূজার মাধ্যমে তা চলবে ষষ্ঠীর রাত পর্যন্ত, সপ্তমী থেকে মায়ের প্রতিমা পূজা শুরু।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পূজার রীতি, নিয়মকানুন, উৎসবকেন্দ্রিক বিনোদনে খানিক পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু এতোটুকু কমেনি পূজার গরিমা । উল্টো রথে কাঠামো পূজার মধ্য দিয়ে প্রতিমা তৈরির শুভারম্ভ, একচালায় মা সিংহবাহিনীর সঙ্গে আছেন ৪ সন্তান, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ। ঠাঁই হয়েছে মহিষাসুরেরও। ২৩৭ বছরের সাবেকি এই পূজার জনপ্রিয়তা আজও শীর্ষে। উৎসবের পাঁচ দিন কার্যত তিল ধারণেরও জায়গা থাকে না ঠাকুরদালানে।
তিনি বলেন, ‘প্রতিবছর যদি আপনি দেখেন প্রতিমা একই রকম প্রতিমা। এই প্রতিমার মুখের ছাঁচ আমাদের কাছে রাখা থাকে। আমাদের প্রতিমাটি আদি বাংলা একচালা প্রতিমা। এখানে দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ সবাই আছেন, অসুর, সিংহ সবাই আছেন।’
শোভাবাজারের দু'টি বাড়িই রাজা নবকৃষ্ণ দেবের তৈরি। পূজার আলাদা আয়োজন হলেও প্রতিমা একই ধরনের। পার্থক্য শুধু মায়ের বাহন সিংহের মুখের আদলে। উত্তর দিকের রাজবাড়ির সিংহের মুখ আদৌতে ঘোড়ার মতো।
তিনি আরও বলেন, ‘এই সিংহ আমাদের এখন রূপোলী রং করা হয়। আগে রুপোর তবক নিয়ে এসে ওখানাতে মারা হতো সিংহের গায়ে।’
একটা সময় প্রতিমার সাজ শয্যার উপকরণ আসত জার্মানি থেকে। আসেম্বল করা হতো রাজবাড়িতে। আর, এখন নদীয়ার কৃষ্ণনগর থেকে সাজসজ্জার উপকরণ আসে রাজবাড়িতে। মা দুর্গাসহ তার সন্তানদের পোশাক তৈরি হয় রীতি মেনেই। দেবী দুর্গার বিদায়ের সময় কনকাঞ্জলী দেয়ার প্রথা এখনো চালু রয়েছে। অতীতে মায়ের বিসর্জনের সময় বাড়ির বড় সধবা নারীদের একটি করে মোহর দেয়া হতো। এখনও দশমীর সকালে রাজার দুটি তলোয়ারের পূজা করার রীতি মানা হয়। মাটি দিয়ে নীলকন্ঠ পাখি তৈরি করে তাতেই হয় মায়ের প্রাণ প্রতিষ্ঠা। আর ভাসানের দিন মা দুর্গার সঙ্গে ঐ পাখি দুটিকেও বিসর্জন দেওয়া হয় গঙ্গায়।
শোভাবাজার রাজবাড়ির অষ্টম প্রজন্ম শংকর কৃষ্ণ দেব বলেন, ‘এই প্রতিমার সাজ কিন্তু কৃষ্ণনগর থেকে আসে। আগে আসত জার্মান থেকে। জার্মান থেকে মেটেরিয়ালস আসত, এখানেতে এসে অ্যাসেম্বল হতো।’
শোভাবাজার রাজবাড়ির নবম প্রজন্ম রীতেশ কৃষ্ণ দেব বলেন, ‘৩২ জন কুলি কাঁধে করে হচ্ছে মাকে গঙ্গার ঘাটে নিয়ে যাওয়া হয়, কাঁধে করে। তো সেই ঘাটে যাওয়া হয়, তারপর ওখানে ঘাট থেকে জোড়া নৌকোয়, দুটো নৌকোর মাঝখানে মাকে রাখা হয়। রেখে মাঝগঙ্গায় নিয়ে যাওয়া হয়, সেখানে তারপর দুটো নৌকো সরে যায়।’
দক্ষিণ দিকের রাজবাড়ির পূজায় অন্ন ভোগের কোন নিয়ম নেই। এর বদলে বাড়িতে লোক দিয়ে মিষ্টি তৈরি করে তা ভোগ হিসেবে নিবেদন করা হয়। এমনকি দশমীর দিন সিঁদুর খেলার প্রচলনও নেই এখানে। শুধু মায়ের পায়ে সিঁদুর লাগিয়ে দেওয়া হয়। আর, বিসর্জনের সময় কাঁধে নয়, বাঁশের মাচা তৈরি করে ৩২ জন মিলে হাতে ধরে নেয়া হয় বিসর্জন ঘাট পর্যন্ত।





