সরকারের দমন-পীড়নের ব্যাপ্তি কতটা ছিল?
শনিবারের মূল বিক্ষোভ কর্মসূচিকে ঘিরে দুই কোটি মানুষের শহর নয়াবাদিল্লিকে কার্যত একটি অবরুদ্ধ দুর্গে পরিণত করে মোদি সরকার। পার্লামেন্ট ভবনের কাছের নির্ধারিত আন্দোলনস্থল ‘যন্তর মন্তর’ সম্পূর্ণ সিলগালা করে দেওয়া হয়। আন্দোলনকারীদের পৌঁছানো ঠেকাতে ৩০ হাজারের বেশি পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন, সাড়ে চারটির বেশি মেট্রো স্টেশন বন্ধ, সেন্ট্রাল দিল্লিতে মোবাইল ইন্টারনেট সেবা স্থগিত এবং অসংখ্য দূরপাল্লার ট্রেন বাতিল করা হয়।
মুম্বাই থেকে বিমানযোগে নয়াবাদিল্লি পৌঁছামাত্র ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে উড়োজাহাজের ভেতর থেকেই আটক করে পুলিশ। এছাড়া জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি, ছাত্রনেত্রী নেহা বোরা এবং পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল ও কেরালার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নসহ শীর্ষ বিরোধী নেতাদেরও আটক করা হয়। শুধু নয়াবাদিল্লিই নয়, মুম্বাইতেও অন্তত ৬০০ জনকে আটক করে পুলিশ।
আটক ব্যক্তিদের পরিণতি কী হলো?
রোববার ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এই গণ-গ্রেপ্তারকে ‘বেআইনি’ আখ্যা দেওয়ার পর পুলিশ অধিকাংশ আটক ব্যক্তিকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। সিজেপি নেতাদের ১ বছর ‘শান্তি বজায় রাখার’ মুচলেকায় মুক্তি দেওয়া হয়েছে। তবে মুক্তি পাওয়ার পরপরই নরেন্দ্র মোদিকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করেছেন সিজেপি প্রধান অভিজিৎ দীপকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, ‘প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোদি ভারতের জন্য একটি লজ্জা। এই দেশ এর আগে কখনো এত বড় ভীরু ও অত্যাচারী শাসক দেখেনি।’
সাংবাদিক, অর্থনীতিবিদ জাঁ দ্রোজসহ অন্যান্য আটক ব্যক্তিরাও ছাড়া পেয়েছেন। তবে কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) সাংবাদিকদের সাময়িক আটক ও সরঞ্জাম জব্দের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
বিক্ষোভ কি অব্যাহত থাকবে?
আটক থেকে মুক্ত হয়েই ফের রাজপথে নামার ঘোষণা দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি ও ছাত্রসংগঠনগুলো। সিজেপির সহ-সমন্বয়ক সৌরভ দাস বলেন, ‘মোদি-শাহ যেভাবে নয়াবাদিল্লিকে দুর্গে পরিণত করে নিজেদের নাগরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন, তাতে একটি বিষয় পরিষ্কার—এই সরকারের টিকে থাকার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন জ্ঞানেশ কুমার। আমরা পিছু হটব না, পূর্ণ শক্তি নিয়ে আবার ফিরছি।’
ইতোমধ্যেই রোববার বিকেলে নয়াবাদিল্লির আর কে আশ্রমে পুনরায় বিক্ষোভ শুরু করলে এআইএসএ সভাপতি নেহা বোরাকে আবারও আটক করে পুলিশ। মুম্বাইসহ অন্যান্য বড় শহরগুলোতেও নতুন করে বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়েছে।
বিরোধী জোটের অবস্থান কী?
কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’ তরুণদের এই আন্দোলনের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে। সোমবার নয়াবাদিল্লিতে বিশাল বিক্ষোভ মিছিলের ঘোষণা দিয়েছে বিরোধী জোট। কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক কে সি বেণুগোপাল বলেছেন, ‘জ্ঞানেশ কুমারকে পদত্যাগ করতেই হবে।’
বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী দীর্ঘদিন ধরেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে সোচ্চার। দলটির সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে বলেছেন, ‘মোদি সরকার ডেমোক্রেসিকে (গণতন্ত্র) অবরুদ্ধ ডেমোক্রেসি বানিয়েছে। কিন্তু গ্রেপ্তার, জেল কিংবা লাঠিচার্জ করে এ দেশের তরুণদের দমিয়ে রাখা যাবে না।’
আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনায় কেন নারাজ সরকার?
ভোটার তালিকা সংশোধনের (এসআইআর) নামে নিয়মবহির্ভূতভাবে ১৩ কোটি ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার পর থেকেই এই অসন্তোষের সূচনা। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি স্থানান্তরিত বা মৃত বলা হলেও একটি বড় অংশ সংখ্যালঘু ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর, যাদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জানা যায়, কমিশনের তিন সদস্যের মধ্যে দুজন কমিশনারই জ্ঞানেশ কুমারের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন।
গত জুলাই মাসে প্রশ্নফাঁস ইস্যুতে তীব্র আন্দোলনের মুখে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ মেনে নিয়েছিল মোদি সরকার। কিন্তু এবার সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রধানের পদত্যাগের দাবিকে মোদি সরকার তার ক্ষমতার ওপর সরাসরি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে। বিজেপি মুখপাত্র সম্বিত পাত্র আন্দোলনকারীদের ‘নৈরাজ্যবাদী’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে দাবি করেছেন, তাদের এই আন্দোলন সম্পূর্ণ ফ্লপ হয়েছে এবং দেশ শান্ত রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও হার্ড নিউজ ম্যাগাজিনের সম্পাদক সঞ্জয় কাপুর বলেন, ‘মোদি সরকার এখন দ্রুত বিশ্বস্ততা হারাচ্ছে। বিজেপি ভয় পাচ্ছে যে জনমত তাদের বিরুদ্ধে মারাত্মকভাবে চলে গেছে এবং পরবর্তীতে তাদের ক্ষমতায় ফেরা কঠিন হবে।’
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া কী?
জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন গণ-গ্রেপ্তারের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে উভয় পক্ষকে গঠনমূলক সংলাপে বসার আহ্বান জানিয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ মোদি সরকারের এই আচরণকে উদীয়মান কর্তৃত্ববাদের লক্ষণ বলে অভিহিত করেছে।
তবে জেনেভায় জাতিসংঘের ভারতীয় মিশন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কড়া জবাব দিয়ে বলেছে, এটি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অযাচিত হস্তক্ষেপ। ভারতের সংবিধান অনুযায়ী শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার বজায় রয়েছে, তবে জনস্বার্থে সেখানে যুক্তিসংগত বিধিনিষেধ প্রয়োগ করার এখতিয়ার সরকারের রয়েছে।
—আল জাজিরার বিশ্লেষণী প্রতিবেদন অবলম্বনে





