হুথি কারা ও তাদের উত্থান
১৯৯০-এর দশকে ইয়েমেনের সুদূর উত্তরাঞ্চলে শিয়াদের জাইদি মতবাদের পুনরুজ্জীবন আন্দোলন হিসেবে হুথি গোষ্ঠীর সূচনা হয়। আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত নেতা হুসেইন বদরুদ্দিন হুথির নামানুসারে এদের হুথি বলা হলেও দলটির প্রাতিষ্ঠানিক নাম ‘আনসারুল্লাহ’ (আল্লাহর সাহায্যকারী)। ২০১১ সালের আরব বসন্তের পর ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের শাসক আলী আবদুল্লাহ সালেহর পতনের প্রেক্ষাপটে নিজেদের অবস্থান সংহত করে তারা। বর্তমান নেতা আবদুল মালিক আল-হুথির নেতৃত্বে ২০১৪ সালে রাজধানী সানা দখল করে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে বিতাড়িত করে গোষ্ঠীটি।
সৌদি আরবের সঙ্গে সংঘাতের কারণ
ইয়েমেনে ইরানের প্রভাব বৃদ্ধি ঠেকানো ও উৎখাত হওয়া সরকারকে পুনর্বাসনের লক্ষ্যে ২০১৫ সালের শুরুর দিকে একটি সামরিক জোট গঠন করে সরাসরি সামরিক অভিযান শুরু করে সৌদি আরব। এতে শুরু হয় দীর্ঘমেয়াদি রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ, যা স্মরণকালের অন্যতম বড় মানবিক সংকট তৈরি করে। তবে পাহাড় ও দুর্গম মরুভূমিঘেরা ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে সৌদি জোটের হাজার হাজার বিমান হামলা সত্ত্বেও হুথিদের হটানো যায়নি। ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় একটি অস্ত্রবিরতি হলেও সাম্প্রতিক সময়ে তা ভেঙে পড়ে।
লোহিত সাগর ও বিশ্ব বাণিজ্যে প্রভাব
ফিলিস্তিনের গাজায় যুদ্ধের প্রতিবাদে ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে লোহিত সাগরে ইসরাইল-সংশ্লিষ্ট ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা শুরু করে হুথিরা। পরবর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে এবং হরমুজ প্রণালি অচল হয়ে পড়লে সৌদি আরব লোহিত সাগর ও বাব-এল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে তেল রপ্তানি বাড়াতে বাধ্য হয়। এ সুযোগে কৌশলগত পেরিম দ্বীপ ও মোখা বন্দরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লোহিত সাগরের নৌপথে একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করে হুথিরা। বিশ্বের মোট সমুদ্রবাণিজ্যের প্রায় ১০ থেকে ১২ শতাংশ এই নৌপথ দিয়ে চলে। হুথিদের হামলার কারণে বিশ্ববাণিজ্যের জাহাজগুলোকে আফ্রিকা ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে।
হুথিদের সামরিক শক্তি ও ইরান সংযোগ
বর্তমানে ইয়েমেনের এক-তৃতীয়াংশ ভূখণ্ড ও প্রায় ৭০ শতাংশ জনগোষ্ঠীর ওপর হুথিদের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। ধারণা করা হয়, তাদের ১ লাখ ৮০ হাজার থেকে ২ লাখ সশস্ত্র যোদ্ধা রয়েছে। গোষ্ঠীটির অস্ত্রাগারে অত্যাধুনিক ড্রোন ছাড়াও রয়েছে প্যালেস্টাইন-২ নামের হাইপারসনিক ক্ষমতাসম্পন্ন মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং তুফান ও বদর সিরিজের একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের দাবি, ইরান ও হিজবুল্লাহ হুথিদের অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সহায়তা করছে। তবে হুথিদের দাবি, তারা নিজস্ব প্রযুক্তিতেই অস্ত্র তৈরি করছে। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল ও ভিন্ন গতির অস্ত্রের সমন্বিত আক্রমণের কৌশলের কারণেই আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত সৌদি সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে তারা শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে।





