সৌদি–হুথি সংঘাত: সানা ও রিয়াদে পাল্টাপাল্টি হামলা, দাহরানে তেল স্থাপনায় আগুন

হুতিদের নিয়ন্ত্রণাধীন ইয়েমেন পেট্রোলিয়াম কোম্পানি
হুতিদের নিয়ন্ত্রণাধীন ইয়েমেন পেট্রোলিয়াম কোম্পানি | ছবি: বিবিসি
0

ইয়েমেনের রাজধানী সানায় হুথি নিয়ন্ত্রিত একটি জ্বালানি ডিপোতে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান হামলার পর রিয়াদসহ সৌদি আরবের একাধিক শহর লক্ষ্য করে ছোড়া বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় শহর দাহরানে তেল কোম্পানি আরামকোর একটি ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। বিবিসির প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

সৌদি জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি জানান, রাজধানী রিয়াদের কাছে চারটি ক্ষেপণাস্ত্র এবং দুটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এসব ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। তবে পূর্বাঞ্চলীয় শহর দাহরানে আরামকোর একটি স্থাপনায় আগুন লাগার কথা নিশ্চিত করেছেন কর্মকর্তারা।

এর আগে মঙ্গলবার রাতে সানার কাছে ইয়েমেন পেট্রোলিয়াম কোম্পানির আল-সাবাহা তেল সংরক্ষণাগারে হামলা চালায় সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট। পাল্টাপাল্টি এই হামলা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রধান বলেছেন, সংঘাতের এই পরিস্থিতির ‘নেতিবাচক প্রভাব সব জায়গার সবার ওপর পড়তে পারে’।

হামলার জবাবে হুথিরা নতুন করে হুঁশিয়ারি দিয়েছে। তারা জানিয়েছে, সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের বিমানবন্দর ও আরামকোর শোধনাগার এবং পূর্বাঞ্চলীয় শহর দাম্মামে অবস্থিত আরামকোর প্রধান কার্যালয় তাদের হামলার লক্ষ্যবস্তু হবে।

এদিকে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সৌদি মন্ত্রিসভার বৈঠকে বলা হয়েছে, সৌদি ভূখণ্ডে সাম্প্রতিক প্রাণঘাতী হামলার পরিণতি ইরান সমর্থিত এই গোষ্ঠীকে ‘ভোগ করতে হবে’।

এর আগে গত শনিবার রিয়াদের বাদশাহ খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৩ জন এবং রোববার একই ধরনের আরেক হামলায় আরও একজন নিহত হন। এ ছাড়া মঙ্গলবার রিয়াদের উত্তরে তিনটি ড্রোন ধ্বংস করার দাবি করে সৌদি সামরিক জোট।

হুথিদের দাবি, সানাসহ ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলে সৌদি জোটের প্রাণঘাতী হামলার জবাবেই তারা সৌদি আরবের বিমানবন্দর, তেল-গ্যাস স্থাপনা এবং সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে। সৌদি জোট বর্তমানে লোহিত সাগর তীরবর্তী উপকূলসহ বেশ কয়েকটি সম্মুখ সমরে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে বিমান সহায়তা দিয়ে আসছে।

মঙ্গলবার বিকেলে সানার আল-সাবাহা তেল সংরক্ষণাগারে জোটের সম্ভাব্য হামলার সতর্কবার্তার পর সেখানকার পেট্রোল পাম্পগুলোতে মানুষের দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। তবে হুথি পরিচালিত ইয়েমেন পেট্রোলিয়াম কোম্পানি এক বিবৃতিতে নাগরিকদের আশ্বস্ত করে জানিয়েছে, ওই স্থাপনায় কোনো পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের মজুত ছিল না এবং সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সব ধরনের পূর্বসতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

২০১৪ সালে হুথিরা সানার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করলে ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। পরবর্তীতে ২০১৫ সালে সরকার পুনর্বহালের লক্ষ্যে সৌদি নেতৃত্বাধীন আরব জোট সেখানে সামরিক হস্তক্ষেপ করে। দীর্ঘদিনের অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি চলতি বছরের জুলাইয়ে ভেঙে পড়ে, যখন হুথিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ‘সামুদ্রিক অবরোধের’ ঘোষণা দিয়ে বিমানবন্দর ও লোহিত সাগরের জাহাজে হামলা চালাতে শুরু করে।

গত সেপ্টেম্বরে বৈশ্বিক নৌবাণিজ্যের অন্যতম প্রধান পথ বাব-এল-মান্দেব প্রণালির কাছে লোহিত সাগর উপকূলের কিছু এলাকা হুথিরা দখল করে নিলে সংঘাত নতুন মাত্রা পায়। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে লিখেছেন, হুথিরা ‘অত্যন্ত খারাপ আচরণ করছে এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তেলের দাম বাড়ানোর চেষ্টা করছে।’ সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সৌদি আরবকে সহায়তা দেয়ার বিষয়ে সরাসরি কোনো সিদ্ধান্তের কথা না জানালেও ট্রাম্প বলেন, তিনি এ বিষয়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানকে হস্তক্ষেপের অনুরোধ জানাতে ‘পারেন’।

জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট থেকে ইয়েমেনে সংঘাত বৃদ্ধির পর শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে অন্তত ৫৪ জন বেসামরিক নাগরিক এবং তাদের অর্ধেকই শিশু। এছাড়া দেশটিতে ২ লাখ ১৬ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং গত তিন সপ্তাহে কলেরায় আক্রান্তের সন্দেহভাজন সংখ্যা ২১৭ থেকে বেড়ে ৬৪৭ জনে পৌঁছেছে।

এএম