প্রথম মেয়াদে দায়িত্ব নেয়ার সময় থেকেই ইউক্রেনকে সহায়তা দেয়ার বিষয়ে ট্রাম্পের এক ধরনের অনাগ্রহ ছিল। ২০১৭ সালে তীব্র চাপের মুখে অনিচ্ছাসত্ত্বেও তিনি ইউক্রেনকে জ্যাভলিন ক্ষেপণাস্ত্র দিতে রাজি হয়েছিলেন। তার মতে, এটি কোনোভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকারের তালিকায় পড়ে না, বরং এটি ইউরোপের নিজস্ব সংকট। এরপর ২০১৯ সালে জো বাইডেন ও তার ছেলের বিরুদ্ধে তদন্তের শর্ত জুড়ে দিয়ে সামরিক সহায়তা আটকে রাখার ঘটনায় ট্রাম্পকে প্রথম দফায় অভিশংসনের মুখেও পড়তে হয়েছিল। এছাড়া রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার একটি প্রকাশ্য ঝোঁক ট্রাম্পের রাজনীতিতে সব সময়ই বিদ্যমান ছিল।
বর্তমান সংকটের মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে রাশিয়ার ডিজেল ও জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে ইউক্রেনের দীর্ঘপাল্লার ড্রোন হামলা। গত ফেব্রুয়ারিতে ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে তীব্র জনঅসন্তোষের মুখে পড়েছেন রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারা। এই পরিস্থিতিতে গত সেপ্টেম্বর থেকেই রাশিয়ার জ্বালানি কেন্দ্রে হামলা বন্ধ করতে জেলেনস্কিকে সরাসরি তাগিদ দিয়ে আসছেন ট্রাম্প। এমনকি ইউক্রেনের হামলায় মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট তেলবাহী চালান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও।
তবে ওয়াশিংটনের সেই নির্দেশ মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে কিয়েভ। তাদের অবস্থান হলো, পাঁচ বছর ধরে চলা রুশ বিমান হামলার জবাবে এটিই তাদের একমাত্র কার্যকর সামরিক প্রতিরোধ। জেলেনস্কির এই অনড় অবস্থানে ক্ষুব্ধ হয়ে ট্রাম্প গত ৯ অক্টোবর মস্কো থেকে ডিজেল কেনার একটি চুক্তির ঘোষণা দেন এবং রুশ ডিজেল আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রির সুযোগ দিতে বিশেষ লাইসেন্স জারি করেন। একই সঙ্গে তিনি রাশিয়ার ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞাও শিথিল করেন। জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ট্রাম্পের এমন পদক্ষেপে কিয়েভের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং সামরিক ময়দানে রাশিয়া বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে।
ইউক্রেন অভিযোগ তুলেছে, জ্বালানি স্থাপনায় হামলা অব্যাহত রাখলে যুদ্ধক্ষেত্রে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দিয়েছে ওয়াশিংটন। যদিও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কিন কর্মকর্তারা এমন চাপের কথা অস্বীকার করেছেন। এর মধ্যেই ইলন মাস্কের স্টারলিংক ইন্টারনেট সেবা সাময়িকভাবে সীমিত হয়ে পড়ায় ফ্রন্টলাইনে ইউক্রেনের ড্রোন অভিযান মারাত্মক বাধার মুখে পড়েছিল, যা পরে ট্রাম্পের হস্তক্ষেপে সচল হয়।
এই চরম উত্তেজনার মধ্যেই শান্তি আলোচনার চেষ্টা অবশ্য থেমে নেই। নরওয়ের অসলোতে অনুষ্ঠিত শান্তি বৈঠকে ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার আবারও রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলা বন্ধের শর্ত তুলে ধরেন। এরপর সেন্ট পিটার্সবার্গে পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেন ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ, যার প্রেক্ষিতে রাশিয়ায় আটক মার্কিন নাগরিক স্টিফেন হাবার্ডকে মুক্তি দেয় মস্কো। জেলেনস্কি জানিয়েছেন, সবকিছু ঠিক থাকলে নভেম্বরের প্রথমার্ধে আবুধাবিতে রাশিয়া, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের মধ্যে নতুন দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে পারে, যা পরবর্তীতে শীর্ষ নেতাদের ত্রিপক্ষীয় আলোচনার পথ তৈরি করতে পারে।





