যুদ্ধ পরিস্থিতিতে হরমুজ সংকট; হুমকির মুখে বৈশ্বিক অর্থনীতি

হরমুজ প্রণালি
হরমুজ প্রণালি | ছবি: সংগৃহীত
0

যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই কঠিন সময় পার করছে ইরানের কৌশলগত হরমুজ দ্বীপের বাসিন্দারা। হরমুজ প্রণালিতে আইআরজিসির কঠোর বিধিনিষেধে স্থবির হয়ে পড়েছে উপকূলবর্তী দ্বীপের প্রধান আয়ের উৎস মাছ শিকার ও পর্যটনশিল্প। যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরানের অর্থনীতিতেও লেগেছে বড় ধাক্কা, আকাশচুম্বী নিত্যপণ্যের দাম। এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে নৌপরিবহন ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক অর্থনীতি হুমকির মুখে পড়েছে বলে সতর্কবার্তা দিয়েছে জাতিসংঘ। আর আরব রাষ্ট্রের পাশাপাশি আফগানিস্তান, পাকিস্তানসহ উত্তর আফ্রিকার অর্থনীতি প্রায় দেড় শতাংশ সংকুচিত হবে বলে শঙ্কা জানিয়েছে আইএমএফ।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতি আলোচনার প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে হরমুজ প্রণালি। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই কার্যত বন্ধ হয়ে আছে বিশ্বের জ্বালানি পরিবহণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এ জলপথ। অপরিশোধীত জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের বড় একটি অংশ এ প্রণালি দিয়ে সরবরাহ হয়। জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় প্রতিদিনই বাড়ছে জ্বালানির দাম। যার প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও।

হরমুজ প্রণালির প্রবেশদ্বার পারস্য উপসাগরের উপকূলে অবস্থিত ইরানের অন্যতম কৌশলগত হরমুজ দ্বীপের জনজীবনও পড়েছে গভীর সংকটে। কয়েক মাসের যুদ্ধে স্থবির হয়ে পড়েছে দ্বীপের ব্যবসা-বাণিজ্য। মাত্র ৪২ বর্গকিলোমিটার আয়তনের দ্বীপটিতে বসবাস প্রায় ৬ হাজার বাসিন্দার। যা ইরানের মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।

হরমুজ দ্বীপের আয়ের প্রধান উৎস মাছ শিকার ও পর্যটন শিল্প। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ধুঁকছে পর্যটন কেন্দ্রগুলো। পর্যটকশূন্য গোটা দ্বীপ। ধীরে ধীরে বন্ধ গেছে হোটেল, মোটেল ও রেস্তোরাঁ। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কঠোর বিধিনিষেধ ও হামলার শঙ্কায় মাছ শিকারেও যেতে পারছে না স্থানীয়রা।

স্থানীয় এক ব্যক্তি বলেন, যুদ্ধ যত তাড়াতাড়ি শেষ হবে, আমাদের জন্য সেটা আশির্বাদ হবে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবারও পর্যটনশিল্প ঘুরে দাঁড়াবে। আমাদের আয়ের পথ খুলবে।’

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আট মাসের বেশি সময়ের যুদ্ধে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতি দেখা দিয়েছে ইরানে। চরম সংকটে ইরানি পরিবারগুলো। দৈনন্দিন খরচ মেটাতে নির্ভর করতে হচ্ছে তাদের সঞ্চয়ের ওপর। বহু পরিবার কমিয়ে দিয়েছে তাদের মৌলিক চাহিদার অনেক খরচও।

এক ইরানি নাগরিক বলেন, ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় মাছ, মাংস ও মুরগির দামও বেড়েছে। কিন্তু মানুষের আর কোনো উপায় নেই। জামা-কাপড় ও জুতার মতো জিনিস কেনা কমিয়ে দিয়েছে অনেকে।

আরও পড়ুন: ভয়াবহ দাবানলের কবলে ইন্দোনেশিয়া, ঝুঁকিতে কয়েক লাখ মানুষ

আরেকজন বলেন, অনেক নিয়মিত খরচ বাদ দিতে এবং অনেক জিনিস ছাড়াই চলার পরিকল্পনা নিয়েছি। মাস শেষ হতে কোনো অর্থ থাকে না।’

উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির প্রভাবে নিত্যপণ্যসহ সবকিছুর দাম এখন আকাশছোঁয়া। চাপের মুখে রয়েছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোও। যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার মুখে আমদানির খরচ বেড়েছে বহু গুণ।

এক ব্যবসায়ী বলেন, ডলারের বিপরীতে ইরানি মুদ্রার মান কমেছে। ইরানের ওপর চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছে অর্থনীতি।’

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার শুধু ইরান নয়, বিরূপ প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের জেরে পণ্য পরিবহণে ব্যাঘাত ও জ্বালানির দাম বাড়ায় বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়বে বলে সতর্কবার্তা দিয়েছে জাতিসংঘ। শুধু বাণিজ্য নয়, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগেও অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা। যা দীর্ঘ সময় ধরে চলবে।

ইউএনডিপির আরব রাষ্ট্র বিষয়ক ব্যুরোর পরিচালক আবদুল্লাহ আল দারদারি বলেন, ‘চলমান সংকট আজ শেষ হলেও এর প্রভাব অন্তত পাঁচ বছর পর্যন্ত স্থায়ী থাকবে। এরই মধ্যে এই সংকট সুদুরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছে। আরব বিশ্ব এক কঠিন বাস্তবতার মুখে পড়েছে, যা থেকে সহজে বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়।’

গেলো সপ্তাহে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল জানিয়েছে যে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের প্রভাবে ২০২৬ সালে মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের অর্থনৈতিক উৎপাদন ১ দশমিক ৩ শতাংশ কমবে। সংস্থাটির মতে, উপসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যে ওমান ছাড়া বাকি সব রাষ্ট্রের অর্থনীতিই সংকুচিত হবে।

এসএইচ