রেলপথে চাপ, তবু শৃঙ্খলায় স্বস্তি
আজ (মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ) সকালে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে দেখা যায়, ভোর থেকেই ঘরমুখো মানুষের ঢল। নারী ও শিশুসহ পরিবার নিয়ে অনেকেই আগেভাগেই স্টেশনে এসে অপেক্ষা করছেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্ল্যাটফর্মগুলো ভরে ওঠে যাত্রীতে।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, বেলা ১১টা পর্যন্ত ২১টি ট্রেন দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে ছেড়ে গেছে। সারাদিনে মোট ৪৪টি ট্রেন চলাচলের কথা রয়েছে। ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে পাঁচ জোড়া বিশেষ ট্রেনও যুক্ত করা হয়েছে। যদিও সিলেটগামী কিছু ট্রেন বিলম্বিত হয়েছে, তবে সামগ্রিকভাবে শিডিউল বিপর্যয় তুলনামূলক কম।
স্টেশনে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে টিকিটবিহীন যাত্রীদের প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। দুই ধাপে টিকিট যাচাইয়ের ফলে প্ল্যাটফর্মে ভিড় থাকলেও বিশৃঙ্খলা তুলনামূলক কম দেখা গেছে। স্ট্যান্ডিং টিকিটের সুযোগ থাকলেও ছাদে ভ্রমণ নিরুৎসাহিত করছে কর্তৃপক্ষ।
যাত্রীরা বলছেন, অনলাইনে টিকিট সংগ্রহে কিছু জটিলতা থাকলেও ব্যবস্থাপনার উন্নতির কারণে ভোগান্তি কিছুটা কমেছে। অনেকেই আগেভাগে টিকিট কেটে নিশ্চিন্তে যাত্রা করছেন।
বাস টার্মিনালে ভিড়, বাড়তি ভাড়ার অভিযোগ
রাজধানীর বাস টার্মিনালগুলোতেও একই চিত্র। গাবতলী বাস টার্মিনাল, সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল ও কল্যাণপুর এলাকায় সকাল থেকেই যাত্রীদের ভিড় বাড়তে থাকে। দুপুরের পর তা জনস্রোতে পরিণত হয়।
আরও পড়ুন
অনেক যাত্রী আগে থেকে টিকিট সংগ্রহ করলেও তাৎক্ষণিক টিকিটের জন্য কাউন্টারগুলোতে দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। যাত্রীদের অভিযোগ, নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে ২০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেয়া হচ্ছে। বাস দেরিতে আসা এবং যানজটের কারণে অনেককে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফিরতি পথে বাস খালি আসায় কিছু ক্ষেত্রে ভাড়া সমন্বয় করা হচ্ছে। তবে সড়কে ধীরগতির কারণে সময়সূচি ঠিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
মহাসড়কে যানজটের শঙ্কা
ঈদযাত্রায় সবচেয়ে বড় উদ্বেগ সড়কপথকে ঘিরে। ইতোমধ্যে ঢাকা-টাঙ্গাইল, ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে ধীরগতির খবর পাওয়া গেছে। বিশেষ করে নির্মাণকাজ, ভাঙাচোরা সড়ক, অতিরিক্ত যানবাহন, অবৈধ পার্কিং এবং তিন চাকার যান চলাচল পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, নবীনগর-চন্দ্রা, কাঁচপুর, সোনারগাঁসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে যানজটের ঝুঁকি বেশি। কুমিল্লার দাউদকান্দি থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত ২০টির বেশি ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্ট চিহ্নিত করেছে হাইওয়ে পুলিশ।
ফেরিঘাটে চাপ, পারাপারে ধীরগতি
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যাত্রীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পাটুরিয়া ফেরিঘাটেও রয়েছে বাড়তি চাপ। প্রতিদিন হাজারো যানবাহন ও যাত্রী পারাপার হলেও কিছু পয়েন্টে মেরামতকাজ চলমান থাকায় ফেরি ওঠানামায় সময় বেশি লাগছে। ফলে যাত্রীদের অপেক্ষাও দীর্ঘ হচ্ছে।
নৌপথে বাড়ছে যাত্রী, প্রস্তুতি জোরদার
নৌপথে তুলনামূলক স্বস্তি থাকলেও যাত্রীচাপ কম নয়। সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায়, দিনভর যাত্রীদের উপস্থিতি থাকলেও বিকেল ও সন্ধ্যার দিকে ভিড় বাড়ছে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) জানিয়েছে, এবারের ঈদে ৮ থেকে ১০ লাখ যাত্রী নদীপথে যাতায়াত করতে পারেন। বর্তমানে ৩৩টি রুটে লঞ্চ চলাচল করছে এবং প্রতিদিন গড়ে ৫৫ থেকে ৬০টি লঞ্চ ঢাকা ছাড়ছে। যাত্রীচাপ সামাল দিতে নিরাপত্তা জোরদার, ফিটনেস যাচাই এবং বিকল্প ঘাট চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনায় জোর
ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল ও লঞ্চঘাটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি জোরদার করা হয়েছে। র্যাব, পুলিশ, নৌ-পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থা সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করছে। ছিনতাই ও হয়রানি ঠেকাতে অস্থায়ী ক্যাম্প ও নিয়ন্ত্রণকক্ষ চালু রাখা হয়েছে।
কষ্টের ভেতরেও আনন্দ
সব মিলিয়ে এবারের ঈদযাত্রায় একদিকে যেমন রয়েছে ভিড় ও ভোগান্তির শঙ্কা, অন্যদিকে ব্যবস্থাপনার কিছু উন্নতিও চোখে পড়ছে। তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে মানুষের চোখেমুখে স্পষ্ট; নাড়ির টানে বাড়ি ফেরার আনন্দই সবচেয়ে বড়। দীর্ঘ অপেক্ষা আর কষ্টের পরও প্রিয়জনের কাছে পৌঁছানোর প্রত্যাশাই তাদের মুখে এনে দিয়েছে স্বস্তির হাসি।





