দেশে হঠাৎ কেন বাড়ছে হাম? লক্ষণ ও প্রতিকারে বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

হামের লক্ষণ ও প্রতিকার
হামের লক্ষণ ও প্রতিকার | ছবি: এখন টিভি
0

বর্তমানে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় হামের (Measles outbreak) প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, শ্বাসতন্ত্রকে আক্রমণকারী এই ভাইরাস অত্যন্ত দ্রুত একজন থেকে অন্যজনে ছড়িয়ে পড়ে। সঠিক সময়ে সচেতন না হলে এটি মহামারি আকার ধারণ করতে পারে।

একনজরে হামের টিকা ও সুরক্ষা তথ্য

টিকার ধরণ (Vaccine Type) প্রতিরোধক (Prevention) পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া (Side Effects)
ইপিআই (EPI) / এমএমআর (MMR) হাম, মাম্পস ও রুবেলা সামান্য জ্বর বা ইনজেকশনের জায়গায় ব্যথা
সুরক্ষার মাত্রা প্রায় ১০০ শতাংশ সুরক্ষা সাধারণত ২-৩ দিনে সেরে যায়

আরও পড়ুন:

হাম হঠাৎ বাড়ার মূল কারণ (Reasons for Rising Cases)

বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম বাড়ার পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ দায়ী:

১. টিকাদানে ঘাটতি: নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি বা ইপিআই (EPI Program) থেকে অনেক শিশু বাদ পড়ায় তাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়নি।

২. অসম্পূর্ণ ডোজ: অনেক ক্ষেত্রে টিকার প্রথম ডোজ নিলেও দ্বিতীয় ডোজ (Missing second dose) না নেওয়ায় শিশুরা ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

৩. ঘনবসতি ও অপুষ্টি: ঘিঞ্জি পরিবেশ এবং পুষ্টিহীনতার কারণে ভাইরাসের বিস্তার (Virus transmission) দ্রুত ঘটছে।

হাম কেন বিপজ্জনক ও টিকার গুরুত্ব (Importance of Vaccination)

হাম কেবল সাধারণ জ্বর বা শরীরে লালচে ফুসকুড়ি (Skin rash) নয়; এটি শিশুদের শরীরে স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে। যেমন:

তীব্র নিউমোনিয়া (Severe Pneumonia): যা থেকে শ্বাসকষ্ট ও মৃত্যু হতে পারে।

মস্তিষ্কের প্রদাহ (Encephalitis): যা শিশুর স্নায়বিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত করে।

বধিরতা ও অন্ধত্ব (Deafness and Blindness): কানের সংক্রমণ বা চোখের জটিলতা থেকে এটি হতে পারে।

আরও পড়ুন:

টিকার ডোজ ও নিয়ম (Vaccination Schedule)

শিশুদের সুরক্ষায় সাধারণত দুই ডোজ টিকা (Two doses of vaccine) দেওয়া হয়:

প্রথম ডোজ: ৯ মাস পূর্ণ হলে।

দ্বিতীয় ডোজ: ১৫ মাস বয়সে।

বড়দের ক্ষেত্রে: যারা শৈশবে টিকা নেননি, তারা ২৮ দিনের ব্যবধানে দুটি ডোজ নিতে পারেন। তবে গর্ভাবস্থায় (During pregnancy) হামের টিকা নেওয়া সম্পূর্ণ নিষেধ।

ইপিআই ছাড়া টিকা দেওয়া যায় কি?

সরকারি টিকাদান কর্মসূচি বা ইপিআই (EPI) ছাড়াও আপনার শিশুকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে টিকা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। অনেক অভিভাবকই বিভিন্ন কারণে সরকারি কেন্দ্রগুলোতে যেতে পারেন না, তাদের জন্য বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকগুলো একটি সহজ বিকল্প হতে পারে।

বেসরকারিভাবে হামের টিকা (Measles Vaccine in Private Facilities)

আপনার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি পর্যায়ে সাধারণত এমএমআর (MMR) টিকা দেওয়া হয়। এই একটি ইনজেকশনের মাধ্যমেই শিশু তিনটি মারাত্মক রোগ থেকে সুরক্ষা পায়:

১. হাম (Measles)

২. মাম্পস (Mumps)

৩. রুবেলা (Rubella)

আরও পড়ুন:

শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা বলছেন, দুই ডোজ টিকা পাওয়ার পরও কেন আবার হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিচ্ছে? এর কারণ, এখনো অনেক জায়গায় অনেক শিশু এই ‘এমআর’ টিকা পায়নি বা টিকা দেওয়ার জন্য তাকে টিকাকেন্দ্রেই নিয়ে যাওয়া হয়নি; কেউ কেউ একটা নিয়েছে। এর ফলে এসব টিকাবঞ্চিত শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি যেমন বেশি, আক্রান্ত হলে অন্যদের মধ্যে ছড়ানোর আশঙ্কাও অনেক বেশি।

অনেক সময় টিকা প্রাপ্তের শরীরে আশানুরূপ হাম প্রতিরোধক অ্যান্টিবডি তৈরি না হলেও সে পুনরায় হামে আক্রান্ত হতে পারে।

শিশুর হাম হলে অভিভাবকরা যা করবেন

অভিভাবকের করণীয় কী হতে পারে, বিষয়টি নিয়ে এই শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ বলছেন, কোনো শিশুর জ্বর এবং শরীরে র‍্যাশ দেখা দিলে তা হাম হোক বা না হোক, চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। শিশুর শরীরে র‍্যাশ দেখা দেওয়ার দিন থেকে অন্তত পাঁচ দিন অন্যদের কাছ থেকে আলাদা রাখতে হবে।

এ সময় আক্রান্ত শিশুর খাবার, পানীয় ও অন্যান্য স্বাভাবিক পরিচর্যা অব্যাহত রাখতে হবে। পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিকসহ তাকে পরপর দুই দিন দুটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ভিটামিন এ ক্যাপসুল বয়স অনুযায়ী সঠিক ডোজে খাওয়াতে হবে।

কোনো শিশুর জ্বর এবং শরীরে র‍্যাশ দেখা দিলে তা হাম হোক বা না হোক, চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

হামে আক্রান্ত শিশুর যদি কোনো বিপদচিহ্ন, যেমন শ্বাসকষ্ট, বারবার বমি, খিঁচুনি বা নিস্তেজ হয়ে পড়া, চোখের মণি ঘোলা হয়ে আসে বা মুখের ভেতর গভীর ঘা থাকে, তাহলে দেরি না করে হাসপাতালে নিতে হবে। সেখানে শিশুকে আলাদা ওয়ার্ডে বা কেবিনে রেখে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিতে হবে।

যদি হামে আক্রান্ত কোনো শিশুর দৃষ্টি সমস্যা বা দেখতে অসুবিধা হয়, কিংবা চোখের মণি ঘোলা লাগে, তাহলে ১৪ দিনের মাথায় আরও একটা ভিটামিন এ ক্যাপসুল (মোট ৩টি) দিতে হবে।

এসআর