রেলপথকে বলা হয় যে কোনো দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ক্রমশ নড়বড়ে হয়ে পড়ছে এ মেরুদণ্ড। ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থাটি এখন লোকসানের এক বিশাল খনি।
প্রতিবেশী ভারত ১০০ টাকা আয় করতে খরচ করে ৯৮ টাকা। তাদের আয়ের ৬৭ শতাংশই আসে পণ্য পরিবহন থেকে। এমনকি ধুঁকতে থাকা পাকিস্তানও তাদের আয়ের ৩৩ শতাংশ পায় পণ্য থেকে। অথচ বাংলাদেশে পণ্য পরিবহন থেকে আয় মাত্র ৫ শতাংশ!
তথ্য বলছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে প্রতিদিন অন্তত ৮টি কনটেইনার ট্রেন চলার কথা। কিন্তু ইঞ্জিনের অভাবে সপ্তাহেও চলছে না একটি। আসন্ন ঈদের দোহাই দিয়ে সব ইঞ্জিন রাখা হচ্ছে প্যাসেঞ্জার ট্রেনের জন্য। ফলে লোকসানে ধুঁকছে কনটেইনার পরিবহন খাত।
অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. সামছুল হক বলেন, ‘আমাদের রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ যাত্রীবান্ধব সার্ভিস দেয়ার জন্যই তাদের মূল ফোকাস। রেলের যে একটা বড় ভূমিকা আছে ব্যবসাবান্ধব পরিষেবা দেয়া, সেটা কিন্তু তারা কখনোই সিরিয়াসলি নেয়নি।
২০২১ সালে যেখানে ১ লাখ টিইইউএস কনটেইনার টানা হতো, ২০২৫-এ তা নেমে এসেছে ৬৯ হাজারে। ফলাফল, ব্যবসায়ীরা বাধ্য হয়ে বেছে নিচ্ছেন সড়কপথ।
আরও পড়ুন:
তিনি বলেন, ‘এই যে দায়বদ্ধতার জায়গা, এটা আমাদের রেলের ভেতরে আমরা দেখি না। এটির প্রকৃষ্ট উদাহরণ যেটা বললাম, আইসিডি একটা করেছি তো করেছি, এরপরে যে আমার করতে হবে, আমি যে ৫ শতাংশের বেশিও ঢাকামুখী কন্টেইনার নিতে পারি না, এর ফলে যে আমার আর্থিক অনেক লাভ হতো, যে লাভ দিয়ে আমার ক্ষতিটা পুষাতে পারতাম, এটার জন্য যে চঞ্চলতা দরকার, এটার জন্য যে দায়িত্ববোধ দরকার, সেটা আমরা কখনো পাই না।’
ইঞ্জিন সংকট আর লোকসানের কারণ খুঁজতে রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে এখন টেলিভিশন। কিন্তু ক্যামেরা দেখে মুখে কুলুপ আঁটেন এই নীতিনির্ধারক। এড়িয়ে যান দায়বদ্ধতার প্রশ্ন।
এমন এড়িয়ে চলার ভিড়ে শেষ পর্যন্ত বগি সংকট ও মান্ধাতার আমলের মডেল নিয়ে নিজেদের সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করলেন এই কর্মকর্তা। দিলেন আশার বাণীও।
বাংলাদেশ রেলওয়ে অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আল ফাত্তাহ এম মাসুদুর রহমান বলেন, ‘কোচ স্বল্পতা এবং মেইনটেন্যান্স ঘাটতি যেটা আমাদের, সেটা ট্র্যাক সাইডেও আছে, রোলিং স্টক সাইডেও আছে। গভর্মেন্টের বর্তমান যে নতুন সরকার আমাদের দেশ পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন, তাদের যে নির্বাচনি ইশতেহার, সেখানে রেলওয়ে সার্ভিসকে ঢেলে সাজানোর বিষয়টি আছে। আমরা সেই অনুযায়ী অলরেডি কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করেছি। আমরা আস্তে আস্তে সেই লক্ষ্যে এগিয়ে যাব।’
এরকম আশার কথা শুনিয়ে গেল কয়েক বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে রেলে। ৩৯ হাজার কোটি টাকায় পদ্মা রেল লিঙ্ক, ১৭ হাজার কোটির যমুনা সেতু; এত টাকা খরচ হলেও তা গতি আনতে পারেনি রেলের আয়ে । উল্টো ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রেলের মোট আয় যেখানে ১ হাজার ৮৪৬ কোটি টাকা, সেখানে ব্যয় হয়েছে দ্বিগুণেরও বেশি।
নতুন সরকার গঠনের পর পণ্য পরিবহনের শেয়ার ৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ইঞ্জিন সংকট আর ভুল নীতির এই দুষ্টচক্র থেকে রেল আদৌ বের হতে পারবে তো?




