অট্টালিকার পর অট্টালিকা, আর নিচে জনসমুদ্র। এর ভেতর কোথাও যেন হারিয়ে গেছে আস্থার শেষ প্রদীপটুকু। প্রতারণার অন্ধকারেরও কিছু চিহ্ন থাকে। যা শুধু শরীরে নয়, খোঁজ নিয়ে দেখবেন তার কিছু অংশ গল্প হয়ে জমা হয় হাসপাতালের বেডেও। প্রশ্ন জাগে, পচন কি শুধু দেয়ালের ভেতর ধরেছে, নাকি তা ছড়িয়ে পড়েছে মানুষের বিবেকের গভীরতম প্রকোষ্ঠেও?
গত কয়েক মাস ধরে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে আসছে অদ্ভুত কিছু রোগী। ক্ষতস্থান প্রায় একই; হাতের তালু, ধরনও অভিন্ন। অথচ ভুক্তভোগীরা এসেছেন একেক জেলা থেকে, একেক গল্প নিয়ে। বিষয়টি চিকিৎসকদের কাছেও অস্বাভাবিক মনে হয়।
জাতীয় বার্ন ইউনিটের প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন বলেন, ‘প্রতিদিন সকালে আমার রোগী নিয়ে আলোচনা করি। ঠিক তেমন এক দিন এক রোগী আসেন, যার হাতের মধ্যে কোনো কিছু নেয়ার কারণে পুড়ে গেছে। এমন রোগী মাসের মধ্যে চার থেকে পাঁচজন পাই। তারপর আমরা ইনকোয়ারি করি। দেখি আমরা যা রোগী পাচ্ছি তার চেয়ে আরও বেশি ঘটছে।’
বার্নে একই ধরনের ক্ষত নিয়ে আসা এমন রোগীদের বিষয়ে চিকিৎসকদের সন্দেহ থেকেই কথা শুরু হয় ভিকটিমদের সঙ্গে। বেরিয়ে আসে প্রতারণার ভয়ংকর কৌশল, যার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন এলাকার বহু মানুষের কাছ থেকে হাজার থেকে লাখ টাকা করে হাতিয়ে নিচ্ছে একটি চক্র। যার পুরোটাই হচ্ছে অনলাইনে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে বা বিভিন্ন জায়গায় পোস্টার লাগিয়ে অসম্ভব কিছু সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেয়া হচ্ছে কবিরাজ ও তান্ত্রিকদের নামে। আর এ প্রলোভনে পড়ছেন অনেকেই। প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো অর্থ না চেয়ে ধর্মীয় বিশ্বাস এনে আস্থা অর্জন করা হয়। এরপর ভিডিওকলের নির্দেশে আগে থেকে কিনে রাখতে বলা জীবাণুনাশক ও ল্যাবে ব্যবহৃত রাসায়নিক, পটাশিয়াম, পারম্যাঙ্গানেট এবং চিনি একসঙ্গে হাতে নিয়ে শক্ত করে মুঠো করে ধরতে।
বলা হয়, যতক্ষণ ধরে রাখা যাবে, তত দ্রুত হবে সমস্যার সমাধান। কিন্তু সেকেন্ডের মধ্যেই শুরু হয় অসহনীয় জ্বালাপোড়া, পুড়ে যায় হাত। এরপর ‘কাজ শুরু হয়ে গেছে’ দাবি করে টাকা পাঠাতে বলা হয় বিকাশের মাধ্যমে। না হলে বিপদ বাড়বে।
একজন বলেন, ‘হাতের মধ্যে কিছু একটা দিয়ে বলে এটা হাত থেকে ফেলা যাবে না। ফেললে আপনার স্বামীর ক্ষতি হবে। আর আমার পুরো শরীরে ফোসকা পড়ে যাবে।’
বার্ন ইউনিটের আরেক রোগীও সেই প্রতারণার শিকার। চোখেমুখে এখনও আতঙ্কের ছাপ। পারিবারিক সমস্যার সমাধান খুঁজতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয় হয়েছিল এক কবিরাজের সঙ্গে। তার কাছেও চাওয়া হয়েছিল অর্থ।
এখন টিভির অনুসন্ধানে রাজশাহীতেও বেরিয়ে আসে একই ঘটনা। এক ভুক্তভোগী জানান, সমস্যা সমাধানের আশায় তিনিও যোগাযোগ করেছিলেন অনলাইনের এক কবিরাজের সঙ্গে। এরপর একইভাবে নির্দেশনা মেনে পটাশ আর চিনি হাতে নিয়ে মারাত্মকভাবে দগ্ধ হন।
রাজশাহীর ভিকটিম একজন বলেন, ‘প্রথমে একজন কবিরাজের কাছে যাওয়ার পর আমাকে একটা ওষুধ দেয়। তারা বলে এটা হাতে রাখতে। যখন বলি হাত জ্বলছে, তারা বলে আপনার এটা ঠিক করে দিবো তার জন্য ৮ হাজার টাকা দেয়া লাগবে।’
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মোছা. আফরোজা নাজনীন বলেন, ‘আঙুলগুলো যখন বাঁকা হয়ে যাচ্ছে ঠিক তখননি আসছে; আর আমরা যতই মেডিসিন ব্যবহার করি না কেন তা আর আগের মতো হবে না। বেশিরভাগই মহিলা, আর আমার কাছে মনে হয়েছে মহিলাদের সঙ্গে প্রতারণা করা সহজ।’
দগ্ধ হয়েও নিজের পরিচয় প্রকাশ করতে এখনও ভয় পান অনেকেই। তাদের বিশ্বাস, মুখ খুললে ক্ষতি হতে পারে পরিবারের সদস্যদের। ভুক্তভোগী একজন বলেন, ‘কাউকে কিছু বলা যাবে না। কারণ আমার পরিবার আছে।’
এ ভয়ই মূল অস্ত্র প্রতারকদের। ভুক্তভোগীদের বলা হয় জ্বিন বা আধ্যাত্মিক শক্তি রেগে গেছে কিংবা ভয়ংকর বিপদ নেমে আসতে পারে পরিবারের ওপর।
একজন ভুক্তভোগীর স্বামী বলেন, ‘প্রথমে আমার স্ত্রী আমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য বলে। আমার ব্যস্ততার কারণে নিয়ে যেতে পারিনি। পরে শুনি তার হাত পুড়ে গেছে।’
আর এ কারণে বেশিরভাগ রোগীই চিকিৎসা নিতে আসেন দেরি করে। চিকিৎসকরা বলছেন, চাপ বা ঘর্ষণে চিনির সঙ্গে মিশে তীব্র তাপ উৎপন্ন করে পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট। আর পোড়া গভীর হলে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে মাংসপেশি, রক্তনালী এমনকি হাড়ও। দীর্ঘ চিকিৎসার পর অনেকেরই হাত আর কখনও স্বাভাবিক হয় না।
জাতীয় বার্ন ইউনিটের প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘সাধারণত অনেক গভীর ক্ষতি হয়। আর এই অবস্থা থেকে সুস্থ হওয়ার জন্য ৬ থেকে ৭ মাস লেগে যায়।’
অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে আমরা ভিকটিম সেজে একাধিক অনলাইন কবিরাজ ও তান্ত্রিকের সঙ্গে যোগাযোগ করি। সামাজিকমাধ্যমে তারা জানান, সমস্যা সমাধানের পুরো প্রক্রিয়াটি হবে ভিডিওকলের মাধ্যমে। ধাপে ধাপে একইভাবে পটাশ-চিনি কেনার নির্দেশনা দিলেও সরাসরি দেখা করার কথা বললে এড়িয়ে যান।
একজন কবিরাজ বলেন, ‘৫২ ঘণ্টার মধ্যে আপনার চাকরি হয়ে যাবে। অফিসের বস আপনাকে বাপ ডাকবে আর সবাই হুজুর হুজুর করবে।’
মাত্র জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটেই কত দিনের মধ্যে এ ধরনের চিকিৎসা নিয়েছেন কত জন। তবে এ নিয়ে সারা দেশে কোথাও মামলার খোঁজ পাওয়া যায়নি। অনেকটা অন্ধকারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।





