জন্মনিয়ন্ত্রণ উপকরণ সংকট: মুখ থুবড়ে পড়েছে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি

পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে নেই প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র
পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে নেই প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র | ছবি: এখন টিভি
0

পরামর্শ মিললেও পাওয়া যায় না জন্মনিয়ন্ত্রণ উপকরণ- মাঠপর্যায়ে মুখ থুবড়ে পড়েছে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি। দুই বছরে পাঁচ ধরনের জন্মনিয়ন্ত্রণ উপকরণের সরবরাহ কমেছে প্রায় ৮৪ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট দ্রুত সামাল দিতে না পারলে জন্মহারের গতিতে রাশ টানা যাবে না। যদিও মন্ত্রীর আশ্বাস, কয়েকমাসের মধ্যেই ফিরবে গতি।

রোদে পোড়া মেঠোপথ ধরে ঘরে ঘরে ছুটছেন হাসিনা আক্তার। পরিবার পরিকল্পনা সহকারী হিসেবে দম্পতিদের বোঝান সচেতনতার পাঠ। কিন্তু সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, নিয়মিত পরামর্শ মিললেও মিলছে না বিনামূল্যে সরকারি জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী।

সেবাগ্রহীতাদের মধ্যে একজন বলেন, ‘আজকে দুই-তিন মাস হবে ও মেডিসিন পাওয়া যাচ্ছে না। উনারা বলতাছে আসবো, এরকম আশ্বাস দিচ্ছে।’

মাঠপর্যায়ের এই সংকট নিয়ে কথা হয় হাসিনা আক্তারের সঙ্গে।

তিনি বলেন, ‘সরকার পক্ষ যদি আমাদেরকে এটা তাড়াতাড়ি দ্রুতগতিতে এটা সাপ্লাই এর ব্যবস্থা করে দেয়, তখন আমরা আরও ভালোভাবে আমাদের পারফরম্যান্স দেখাতে পারবো বা ভালোভাবে কাজ করতে পারবো আরকি মাঠে।’

কুমিল্লার সীমান্তবর্তী শশীদল ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র— ভেতরে যেন এক পরিত্যক্ত, ভুতুড়ে নীরবতা। অকেজো হয়ে পড়ে আছে যন্ত্রাংশ, নেই প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র। গত এক সপ্তাহে সেবা নিতে এসেছেন হাতেগোনা কয়েকজনই।

আরও পড়ুন:

পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের একজন বলেন, ‘দৈনিক ৭০-৮০ জন হইতাছে। সাধারণ রোগী, পদ্ধতি, গর্ভবতী, প্রসব পরবর্তী সব সেবাগুলা। এখন সাপ্লাই নেই অনেকদিন ধইরা এখানে মানুষ একটা আসে না।’

মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিত্রটা আবার উল্টো-প্রতিদিন সেবাগ্রহীতার আনাগোনা লেগেই থাকে। তবে সরবরাহ-সংকটে মেলে শুধু পরামর্শটুকুই।

সিংগাইর উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শিকা সেলিনা আক্তার বলেন, ‘ফ্যামিলি প্ল্যানিং সেবা বলতে নাই বললেই চলে। একমাত্র সুখী থার্ড আছে। সেটা তাও মাসে অল্প কিছু দেয়া হয়।’

সেবাগ্রহীতাদের মধ্যে একজন বলেন, ‘আমরা পরিবার পরিকল্পনা অফিসে এসে সেবা পাচ্ছি, কিন্তু আমাদের যে মেডিসিনগুলো পাওয়ার কথা সেগুলো আমরা পাচ্ছি না।’

সিংগাইর ছাড়িয়ে এখন টিভি প্রতিনিধি দলের পরবর্তী গন্তব্য পদ্মাতীরের হরিরামপুর। উত্তাল পদ্মা পাড়ি দিয়ে ছুটে চলা দুর্গম চরাঞ্চল পাটগ্রামের পথে। ঢেউয়ের তালে দুলতে থাকা নৌকাই যেন বলে দেয়-এই জনপদে পৌঁছানো মানেই এক কঠিন সংগ্রাম। এখানে নেই মাঠকর্মীর নিয়মিত পরিদর্শন-পরামর্শ, নেই সরবরাহটুকুও।

আরও পড়ুন:

লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘চর অঞ্চলে পরিবার পরিকল্পনার কিছু লোক নিয়োগ দিছিলো। নিয়োগ দেয়ার পরে সরকার পতন হওয়ার পরে নিয়োগটা বাতিল করে দিছে।’

স্থানীয় একজন নারী বলেন, ‘পরিবার পরিকল্পনা থেকে আপা সাত মাস আগে আইছিল, আইসা আমারে মেডিসিন দিয়ে গেছে।’

পরিসংখ্যান বলছে - গত দুই বছরে চাহিদার তুলনায় জন্মনিয়ন্ত্রণ উপকরণের সরবরাহ কমেছে প্রায় ৮৪.৬৩ শতাংশ। এর মধ্যে প্রতি মাসে প্রয়োজনের তুলনায় কনডমের সরবরাহ কমেছে ৯১.৫৭ শতাংশ। ওরাল পিল ও ইনজেকটেবল সরবরাহ কমেছে যথাক্রমে প্রায় ৭৫ ও ৯৮ শতাংশ। উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে ইমপ্ল্যান্ট ও আইইউডির ব্যবহারও।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পূর্বে অপারেশন প্ল্যানের আওতায় জন্মনিয়ন্ত্রণ ও মাতৃস্বাস্থ্যের জরুরি উপকরণ কেনা হতো। তবে ২০২৫ সালে ওপি ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর প্রকট হয় সংকট। তবে এবারের বাজেটে সরকার শুধু এক হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী কেনার জন্য।

আরও পড়ুন:

মানিকগঞ্জ পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপপরিচালক জাকিয়া আখতার বলেন, ‘সেক্টর প্রোগ্রামটি যখন শেষ হয়ে গিয়েছে, নতুন কার্যক্রম হাতে নিতে সময় লেগেছে এবং একটি নতুন ডিপিপি তৈরি হয়েছে, এটাও একটা সময় লেগেছে। এর মধ্য দিয়ে বাজেটের একটা ক্রাইসিস ছিল; এই সবকিছু মিলেই সংকটটা তৈরি হয়েছে।’

কুমিল্লা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপপরিচালক স্বপন কুমার শর্মা বলেন, ‘এই পণ্যগুলো মজুদ এই মুহূর্তে বিভিন্ন আইটেমের কিছু ঘাটতি আছে। সব ধরনের পণ্য নিরবচ্ছিন্নভাবে আমাদের সরবরাহ নেই। যে পণ্যটা যখন আমাদের আসছে, সেটা আমরা সেবা প্রদানকারীদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছি।’

মাঠ পর্যায়ে এই স্থবিরতার ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ, গর্ভপাত ও মাতৃমৃত্যু হারে। ইউনিসেফের এমআইসিএস প্রতিবেদন বলছে-২০১১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত প্রজনন হার ২.৩ থাকলেও ২০২৫-এ তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ২.৪-এ। একই সময়ে, ২০২২ সালের তুলনায় আনুমানিক প্রায় ১৬ লাখ অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ, ৯ লাখ গর্ভপাত এবং সাড়ে তিন হাজার প্রতিরোধযোগ্য মাতৃমৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়নি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রয়োজন জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে গতি সঞ্চার করা।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘জন্মনিয়ন্ত্রণের কাজগুলো দ্রুত শুরু করা দরকার এবং জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী আমদানি করা বা দেশে তৈরির ব্যবস্থা করে প্রত্যেকটা ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়ার যে কার্যক্রম একসময় চলতো, সেটাকে আবার পুনরায় গতি সঞ্চার করতে হবে। সমাজের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের যে ইনডেক্স বা মান, সেখানে অবনমন আমরা দেখব, এরমধ্যেই যেটি দেখতে শুরু করেছি।’

আরও পড়ুন:

জন্মনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সামগ্রিক কার্যক্রম নিয়ে এখন টিভির দল কথা বলে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রীর সঙ্গে। মাঠ পর্যায়ে উপকরণের ঘাটতি, পরামর্শ কার্যক্রমের স্থবিরতা এবং জন্মহার বৃদ্ধির যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে, সেখানে কী ধরনের উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার?

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘অনেক জায়গায় দেখা যায় আমাদের মেটেরিয়ালস নাই বলে অনেকে কাজে যায় না। এটা আমরা সব স্ট্রিমলাইনে এই সপ্তাহের মধ্যে নিয়ে আসতেছি। কাউন্সেলিং করতে হবে, সেটা একসময় হয়েছে। আমাদের রেকর্ডে গত পাঁচ বছর যাবৎ ফ্যামিলি প্ল্যানিংয়ের কোনো অ্যাক্টিভিটিজই হয় নাই। আর মেটেরিয়ালসগুলো তাড়াতাড়ি পাওয়ার জন্য আমরা যারা বিডার্স ছিল, তাদেরকে আমরা চাপে রাখছি যাতে তাড়াতাড়ি দেয় উইদাউট এনি ফারদার ডিলে। কনডমটা খুব তাড়াতাড়ি আমরা পেয়ে যাবো, উই আর সাফিসিয়েন্ট। ট্যাবলেটটা পাইতে আমাদের একটু টাইম লাগবে। আগামী বছরের মধ্যে আমরা প্রোডাক্টিভিটি হারটাকে মানে ফার্টিলিটিটাকে আমরা কমিয়ে আনবো।’

অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫ অনুযায়ী দেশে মোট জনসংখ্যা ১৭ কোটি ২২ লাখের মত। বার্ষিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১.১২ শতাংশ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে প্রজনন হার বেড়ে যাওয়ায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির শঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।

এসএস