আজ (সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর) ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর আলম স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ প্রতিবাদ জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে এক অনুষ্ঠানে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা করেছিলেন, কেবল উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। ওই বক্তব্যের প্রতিবাদে তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সোচ্চার হয়েছিলেন।
ছাত্রদলের ভাষ্য, পরবর্তী সময়ে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের যে ধারাবাহিক সংগ্রাম গড়ে ওঠে, তার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজ।
ছাত্রদলের দাবি, বাংলার স্বাধিকার আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্র ডাকসুর সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি প্রদর্শন ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতা সংগ্রামের ঐতিহ্যের প্রতি অবমাননা।
সংগঠনটি ডাকসুর বর্তমান নেতৃত্বেরও সমালোচনা করেছে। বিজ্ঞপ্তিতে অভিযোগ করা হয়, সাধারণ শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট, অধিকার আদায় ও শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার পরিবর্তে বর্তমান পরিষদ নিজেদের রাজনৈতিক ও আদর্শিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে ডাকসুকে ব্যবহার করছে।
মধুর ক্যান্টিনের নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ এবং সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি যুক্ত করার বিষয়কে একই ধারার কর্মকাণ্ড হিসেবে উল্লেখ করে ছাত্রদল দাবি করেছে, এসবের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিকামী চেতনাকে উপেক্ষা করা হচ্ছে।
ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির বলেন, অবিলম্বে সংগ্রহশালা থেকে জিন্নাহর ছবি সরিয়ে ফেলতে হবে। পাশাপাশি ডাকসুকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর আদর্শ চর্চার স্থান হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করতে হবে।
সংগ্রহশালা উদ্বোধনের পর সেখানে গিয়ে দেখা যায়, মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবি রয়েছে। এর মধ্যে একটি ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে দেয়া তার বক্তব্যের সময়ের ছবি।
এছাড়া ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের সময়ের একটি গ্রুপ ছবিতে জিন্নাহকে দেখা যায়। অন্যটি ১৯৭০ সালের নির্বাচন নিয়ে পাকিস্তানের ডন পত্রিকায় প্রকাশিত জিন্নাহর ছবি সংবলিত প্রতিবেদনের কাটিং।
ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণআন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা জানান, জিন্নাহর আলাদা কোনো ছবি রাখা হয়নি, বরং সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনার ছবি সংগ্রহশালায় রাখা হয়েছে।
১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত সময়ের অংশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি একটি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ইচ্ছা হয়নি, তাই রাখিনি।’
সংস্কার শেষে গতকাল (রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর) ডাকসু ভবনের নিচতলায় সংগ্রহশালাটি উদ্বোধন করা হয়। এসময় ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম, জিএস এস এম ফরহাদসহ পরিষদের অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
সংগ্রহশালায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ইতিহাস থেকে শুরু করে ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, ২০০৯ পরবর্তী বিভিন্ন আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের নানা ছবি স্থান পেয়েছে। সেখানে আবদুল হামিদ খান ভাসানী, এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, এম এ জি আতাউল গণি ওসমানী, নবাব সলিমুল্লাহ, জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়াসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির ছবিও রয়েছে।
তবে সংগ্রহশালায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কোনো একক বা গুরুত্বপূর্ণ ছবি নেই। ১৯৭৪ সালে তার দুই ছেলের বিয়ের ছবি এবং বঙ্গবন্ধুর ছবি সংবলিত তিনটি সংবাদপত্রের কাটিং সেখানে রাখা হয়েছে। ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ছয় দফা, আগরতলা মামলা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচন বা ৭ মার্চের ভাষণসংক্রান্ত বঙ্গবন্ধুর কোনো ছবি সেখানে দেখা যায়নি।
সংগ্রহশালায় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের বিভিন্ন ছবি, ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক পিয়ারু সরদারের ছবি, মাহবুব উল আলম চৌধুরীর ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ কবিতার উল্লেখসহ বিভিন্ন উপকরণ রাখা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের ১১ সেক্টরের কমান্ডার, পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহিদ বুদ্ধিজীবী এবং সাত বীরশ্রেষ্ঠের ছবিও রয়েছে।
১৯৭১ থেকে ১৯৮১ সালের অংশে শেখ মুজিবুর রহমানের দুই ছেলের বিয়ের ছবি ও তার ছবি সংবলিত তিনটি সংবাদপত্রের কাটিংয়ের পাশাপাশি ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের ছবি রয়েছে। জিয়াউর রহমানের সময়ের খাল খননের দৃশ্য, জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার একটি ছবি, মুক্তিযুদ্ধকালীন জিয়াউর রহমানের দুটি ছবি এবং ১৯৭৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ব্যালট পেপারের ছবিও রাখা হয়েছে।
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অংশে ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সালের বিভিন্ন ঘটনার ১৪টি ছবি রয়েছে। এর মধ্যে শহিদ নূর হোসেনের বহুল পরিচিত ছবি, ডাকসুর আন্দোলনের বিভিন্ন দৃশ্য এবং শহিদ আসাদকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে নেয়ার ছবিও রয়েছে।
২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের অংশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে শাহবাগ আন্দোলন, ২০১৩ সালের হেফাজতে ইসলামের আন্দোলন, বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ ও সানি হত্যাকাণ্ড, ২০২০ সালের মোদিবিরোধী আন্দোলন এবং জুলাই অভ্যুত্থানের বিভিন্ন ছবি স্থান পেয়েছে। এছাড়া ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদির গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর থেকে তার জানাজা ও দাফনের বিভিন্ন ছবিও রয়েছে।
এদিকে, ২০১৯ সালের ডাকসু নির্বাচনে নির্বাচিত সহসভাপতি নুরুল হক নুরের নাম থাকলেও, সাধারণ সম্পাদক পদটি ফাঁকা রাখা হয়েছে। ওই নির্বাচনে জিএস নির্বাচিত হয়েছিলেন তৎকালীন ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ সংগঠন) সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। পরবর্তী সময়ে তার ছাত্রত্ব নিয়ে বিতর্কের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ওই পদে রাশেদ খাঁনকে ঘোষণা করে।
জিএস পদটি ফাঁকা রাখার বিষয়ে ডাকসুর বর্তমান জিএস এস এম ফরহাদ জানান, গোলাম রাব্বানী ও রাশেদ খাঁন দুজনের বিষয়েই বিতর্ক রয়েছে। ডাকসুর ওই কমিটির মেয়াদও শেষ হয়ে গেছে। এ কারণে কারও নাম ঘোষণা করা হয়নি।
তবে ডাকসুর সাবেক এক নেতা দাবি করেছেন, এর আগে সংগ্রহশালায় জিন্নাহর কোনো ছবি ছিল না। ছাত্রশিবিরের নেতৃত্বে বর্তমান পরিষদ আসার পরই ছবিটি যুক্ত করা হয়েছে।
সংগ্রহশালার সাবেক কর্মচারী গোপালচন্দ্র দাসও দাবি করেন, তিনি ১৯৯১ সাল থেকে সেখানে কাজ করেছেন এবং তার জানা মতে আগে কখনো জিন্নাহর ছবি সেখানে ছিল না। বঙ্গবন্ধুর ছবি সরিয়ে ফেলার বিষয়েও তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
এদিকে ছাত্রদল তাদের বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক চেতনা রক্ষায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে যেকোনো অপশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।





